সোমবার, ২৩ জুলাই ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

বৃহস্পতিবার, ০৪ জানুয়ারী, ২০১৮, ০৯:৩২:২৯

আবারও চায়না-বাংলা সিরামিকসের ৬২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

আবারও চায়না-বাংলা সিরামিকসের ৬২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

ঢাকা : চায়না-বাংলা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (সিবিসি) বিরুদ্ধে এবার প্রকৃত উৎপাদিত পণ্যের তথ্য গোপনের মাধ্যমে মূসক ও সম্পূরক শুল্কসহ প্রায় ৬২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠে।

সম্প্রতি এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-মূল্য সংযোজন কর শাখা এ ফাঁকি উৎঘাটন করেছে। সিবিসি সিরামিককে ফাঁকিকৃত রাজস্ব পরিশোধে দাবিনামা ও কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছে।

২০০১ সালে বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের এ রাজস্ব ফাঁকি উৎঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

চায়না-বাংলা সিরামিক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালনাকে এ ব্যাপারে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ ও কারণ দর্শানোর জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।

এর আগে সিবিসি সিরামিকের ১৮ কোটি ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫৯ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উৎঘাটন করে এলটিইউ। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দাখিলপত্রে প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপন করে এ ফাঁকি দেয়।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে ২০০১ সালে মেসার্স চায়না-বাংলা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (সিবিসি) প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০০২ সালের আগস্ট মাসে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।

প্রতিষ্ঠানটি সিবিসি সিরামিক এবং হোমোজিনি টাইলসের উত্পাদন শুরু করে। এখানে অত্যাধুনিক মেশিনে প্রতিদিন ৬ হাজার বর্গমিটার সিবিসি সিরামিক এবং হোমোজিনি টাইলসের উত্পাদন করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির ফ্যাক্টরি তারাব রূপগঞ্জ নারায়নগঞ্জে। সিবিসি টাইলস এখনম পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও রপ্তানি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি ডিলারের মাধ্যমে সারাদেশে সিবিসি ওয়াল এবং ফ্লোর টাইলস বাজারজাত করে থাকে।

সূত্র আরও জানায়, সিবিসি সিরামিক প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে। প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর ধরে প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপনসহ নানা কৌশলে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে।

অভিযোগের ভিত্তিতে এলটিইউ দুইটি তদন্ত দল গঠন করে। তদন্ত দল প্রতিষ্ঠানটির নারায়নগঞ্জের কারখানা ও প্রধান কার্যালয় (ন্যাশনাল প্লাজা, ১০৯, বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, ঢাকা) পরিদর্শন করে।

তদন্ত দল কারখানা ও প্রধান কার্যালয় থেকে দাখিলপত্র (ভ্যাট রিটার্ন) ও ২১টি ডেলিভারি রিপোর্ট সম্বলিত ইনভয়েস ফাইলসহ বিভিন্ন দলিলাদি সংগ্রহ করে। এছাড়া আর কোন ইনভয়েস পায়নি তদন্ত দল।

দাখিলপত্র পর্যালোচনা করে তদন্ত দল ২০১৬ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১৮ কোটি ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫৯ টাকা রাজস্ব ফাঁকি খুঁজে পায় এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মামলা করে।

সূত্র আরও জানায়, পরিদর্শনের সময় কারখানার একটি গোপন কক্ষ থেকে বেশ কিছু বাণিজ্যিক ফাইল ও কিছু ব্যবসায়িক দলিল উদ্ধার করে। এর মধ্যে কাঁচামাল ও পণ্যের ফাইল বেশি।

এসব ফাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাচভিত্তিক তারিখসহ উৎপাদিত পণ্যের নাম, সাইজ, উৎপাদনের পরিমাণ ও ব্যবহৃত কাঁচামালের পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর রয়েছে।

সূত্র জানায়, দুইটি তদন্ত দল আবার ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটির কারখানা ও প্রধান কার্যালয় আকস্মিক পরিদর্শন করেন। তারা তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে মূসক রেজিস্ট্রারসহ বাণিজ্যিক দলিলাদি জব্দ করে।

পরিদর্শনে ৩৩টি ফাইল পাওয়া যায়। যাতে উৎপাদিত পণ্যের নাম, সাইজ, গ্রেড এর আলাদা আলাদাভাবে উৎপাদনের পরিমাণ এবং কাঁচামালের ব্যবহার সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।

কাঁচামাল ব্যবহারের তথ্য যথাযথভাবে উৎপাদনে ব্যবহার হয়েছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য মূসক-১৬ রেজিস্টার প্রয়োজন হয়। পরিদর্শনের সময় মূসক-১৬ রেজিস্টার পাওয়া যায়নি।

প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে ২০১৩ সালের মূসক-১৬ রেজিস্টার দিয়ে সহযোগিতা করতে তদন্তকারী কর্মকর্তারা বারবার চিঠি দেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে তা দেয়নি।

পরে তদন্ত দল ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিবিসি সিরামিকের ব্যাচভিত্তিক কাঁচামাল ব্যবহার ও পণ্যের তালিকা অনুযায়ী হিসাব করে।

এসময়ে উৎপাদিত পণ্যের সাথে মূসক-১৭ রেজিস্টারে বিক্রয় তথ্য এন্ট্রি না করে প্রদেয় রাজস্বের তথ্য গোপন করে উৎপাদিত পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে অপরিশোধিত মূসক ও শুল্ক ফাঁকি হিসাব করা হয়।

এতে মোট ৬১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯৭ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উৎঘাটন করে তদন্ত দল। প্রতিষ্ঠানটি এক্ষেত্রে সুকৌশলে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪ বছরে এ রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।

প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত উৎপাদিত পণ্যের তথ্য বাণিজ্যিক রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করলেও মূসক-১৭ রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ না করে সরবরাহ করায় ৪ বছরে ৩৩ কোটি ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ৫৬৩ টাকার মূসক ফাঁকি দিয়েছে।

এরমধ্যে ২০১৩ সালে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ টাকা, ২০১৪ সালে ৯ কোটি ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭২০ টাকা, ২০১৫ সালে ১৮ কোটি ২৭ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৩ টাকা ও ২০১৬ সালে ৪ কোটি ২৬ লাখ ৭২ হাজার ৩৫৮ টাকা।

৪ বছরে ২৮ কোটি ৮১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৩১ টাকার সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। এরমধ্যে ২০১৩ সালে ১ কোটি ৩৩ লাখ ৮০ হাজার ৭৪৮ টাকা, ২০১৪ সালে ৭ কোটি ৮৭ লাখ ৭৬ হাজার ২৭৭ টাকা।

২০১৫ সালে ১৫ কোটি ৮৯ লাখ ১০ হাজার ১০৮ টাকা ও ২০১৬ সালে ৩ কোটি ৭১ লাখ ৬ হাজার ৩৯৮ টাকা। মূসক ও সম্পূরক শুল্কসহ সর্বমোট ৬১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯৭ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১ এর ধারা-৫৫ এর উপধারা (১) অনুযায়ী এ ফাঁকিকৃত রাজস্ব পরিশোধে প্রাথমিক দাবিনামা (ডিমান্ড নোট) জারি ও কারণ দর্শানোর জন্য প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে এলটিইউ এর একজন কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ নোটিশের জবাব ও অপরিশোধিত রাজস্ব পরিশোধ করা না হলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে চায়না-বাংলা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমরা এলটিইউ থেকে নোটিশ পেয়েছি। আমরা জবাব দেব। তবে এলটিইউ যে ফাঁকির কথা বলেছে আমাদের ফাঁকি তো হয়নি, বরং আমাদের উপদেষ্টারা বিষয়টি দেখছেন। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।

 

আজকের প্রশ্ন

খুলনা সিটি নির্বাচনের ভোটকে ‘প্রহসন’ বলেছেন বিএনপি ও বামপন্থিরা। আপনি কি একমত?