বুধবার, ১৫ আগস্ট ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

বৃহস্পতিবার, ০৯ আগস্ট, ২০১৮, ০১:০২:৫৭

দেড় হাজার কোটি টাকা খেলাপি, আরো ১০০০ কোটি দেয়ার প্রস্তুতি

দেড় হাজার কোটি টাকা খেলাপি, আরো ১০০০ কোটি দেয়ার প্রস্তুতি

খুলনা: খুলনার পাট ব্যবসায়ীদের ঋণ দিয়ে বিপদে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। খুলনায় ব্যাংকটির ছয় শাখা থেকে পাট ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়া হয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি হয়ে গেছে। পাট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এ টাকা আদায় না করেই নতুন করে আরো হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়ার আয়োজন চলছে। এর অংশ হিসেবে সাত খেলাপিকে ৭১ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার অনুমোদন এরই মধ্যে হয়ে গেছে। যদিও তাদের কাছে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে ২৩১ কোটি টাকা।

খেলাপি পাট ব্যবসায়ীদের নতুন করে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্তে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির খুলনাঞ্চলের কর্মকর্তাদের মধ্যে। সোনালী ব্যাংক খুলনাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. আমীর হোসেন। শহরের ফেরিঘাট এলাকায় সোনালী ব্যাংক খুলনার আঞ্চলিক কার্যালয়ে বসেন তিনি। গত ৩০ জুলাই মহাব্যবস্থাপকের দপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ কোনো বৈঠকে বসেছেন। বৈঠকে অংশ নিয়েছেন আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজিএম, এজিএমসহ জ্যেষ্ঠ সব কর্মকর্তা। তাদের সবার চোখেই উদ্বেগের ছাপ। নানা জিজ্ঞাসার কোনো সদুত্তর পাওয়া গেল না কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। পরবর্তী তিনদিন কার্যালয়টির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, উদ্বেগ আর আতঙ্কের কারণ পাট ব্যবসায়ীরা।

এ উদ্বেগ-আতঙ্কের যৌক্তিক কারণও জানা গেল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। এরই মধ্যে পাট ব্যবসায়ীদের ঋণ দিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন বেশ কয়েকজন ব্যাংকার। পদোন্নতিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হতে হয়েছে তাদের। পাট ব্যবসায়ীদের তুষ্ট করতে না পারার অর্থ প্রতিনিয়ত বদলির আতঙ্ক।

সোনালী ব্যাংকের তথ্য বলছে, প্রভাবশালী মহলের তদবির ও চাপের কারণে ২০০৮-১৬ সাল পর্যন্ত ভুঁইফোড় অনেক ব্যবসায়ীকে ঋণ দিতে বাধ্য হয় সোনালী ব্যাংক। বেশির ভাগ গ্রাহকই পরে ব্যাংকের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেননি। যে ১১৩ পাট ব্যবসায়ীকে ঋণ দেয়া হয়েছিল, তাদের ১০৮ জনের ঋণই এখন খেলাপি। খুলনায় সোনালী ব্যাংকের ছয়টি শাখা থেকে দেয়া হয় প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ঋণ। এর মধ্যে খুলনার করপোরেট শাখা, দৌলতপুর কলেজ রোড শাখা ও স্যার ইকবাল রোড শাখার বিতরণকৃত ঋণের প্রায় শতভাগই খেলাপি।

সিসি প্লেজ, সিসি হাইপো, পিসিসি ও ব্লক হিসাবের বিপরীতে কাঁচা পাট রফতানিতে এ ঋণ সুবিধা দেয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে সিসি প্লেজ হিসাবের বিপরীতে। গুদামে মজুদ থাকা পাট জামানত রেখে প্লেজ ঋণ দেয়া হয়। ব্যাংক ঋণের টাকা ফেরত না পেলেও গুদামের পাট বিক্রি করে দিয়েছেন ঋণখেলাপিরা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের কারণে এসব ঋণখেলাপিকেই নতুন করে টাকা দিতে হচ্ছে বলে জানান সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল্ মাসুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, খুলনার পাট ব্যবসায়ীরা সোনালী ব্যাংককে ডোবাচ্ছেন। পাট খাতের সব মন্দ গ্রাহক আমাদের ব্যাংকে ভিড়েছেন। নীতিমালার মধ্যে থেকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েও ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে ব্যাংকের টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার কারণে ঋণখেলাপিদের নতুন করে টাকা দিতে হচ্ছে।

সোনালী ব্যাংকের তথ্যমতে, ব্যাংকটির খুলনা করপোরেট শাখা কাঁচা পাট রফতানিতে ৫২ ব্যবসায়ীকে মোট ৩৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩৮১ কোটি ৯৩ লাখ টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। এ খাতে শাখাটির বিতরণকৃত ঋণের ৯৯ দশমিক ৪৮ শতাংশই এখন খেলাপি। খুলনার দৌলতপুর করপোরেট শাখা থেকে কাঁচা পাট রফতানির নামে ৬৬৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন ১৯ পাট ব্যবসায়ী। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৪৩৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা খাতটিতে বিতরণকৃত ঋণের ৬৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ব্যাংকটির খুলনার দৌলতপুর কলেজ রোড শাখা থেকে ২০ জন গ্রাহক ঋণ নিয়েছেন ৩২২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩১৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বা ৯৮ দশমিক ৮৮ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।

ব্যাংকটির খালিশপুর শাখা থেকে ১৩ পাট ব্যবসায়ীকে দেয়া ৮০ কোটি ৫৭ লাখ টাকার মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৫৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ শাখা থেকে খাতটিতে বিতরণকৃত ঋণের ৬৯ দশমিক ৯১ শতাংশই খেলাপি। এছাড়া ব্যাংকটির খুলনার স্যার ইকবাল রোড শাখা থেকে দুজন পাট রফতানিকারককে দেয়া ৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকার পুরোটাই খেলাপি হয়ে গেছে।

খুলনাঞ্চলে সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ ৩০ ঋণখেলাপির কাছে ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে মো. এমদাদুল হোসেনের সোনালী জুট মিলস লিমিটেডের কাছে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১২৭ কোটি, অশোক কুমার দাশের এ কে জুট ট্রেডিংয়ের কাছে ১১৭ কোটি, সেলিম রেজার মেসার্স রেজা জুট ট্রেডিংয়ের কাছে ৩৮ কোটি ও সনজিত কুমার দাশের ইস্টার্ন ট্রেডার্সের কাছে ৯২ কোটি টাকা। এর বাইরে মেসার্স শরীফ জুট ট্রেডিংয়ের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৩ কোটি, জাহিদুল ইসলামের মেসার্স জুয়েল জুট লিমিটেডের ৪৯ কোটি, মেসার্স সিরাজুল ইসলামের ৪০ কোটি, আলীফ জুট ট্রেডিংয়ের ৩৬ কোটি, অনিক জুট ইন্টারন্যাশনালের ৩০ কোটি, সানরাইজ ইন্টারন্যাশনালের ৩০ কোটি, অগ্রণী পাট সংস্থার ২৮ কোটি, মেসার্স শরীফ মোল্লার ২৫ কোটি, মেসার্স আবুল কাশেমের ২২ কোটি, এসআর জুট ট্রেডিংয়ের ২৩ কোটি, রমিজ উদ্দিন ভূইয়ার প্রমি জুট ট্রেডার্সের ২০ কোটি, মনোয়ারা জুট ফাইবার্সের ১৮ কোটি ও এসঅ্যান্ডএস জুট ট্রেডিং কোং লিমিটেডের ১৮ কোটি টাকা। এছাড়া মেসার্স হাফিজ অ্যান্ড ব্রাদার্সের কাছে ১৭ কোটি, রাষ্ট্রায়ত্ত আলীম জুট মিলস লিমিটেডের ১৬ কোটি, রোজেমকো লিমিটেডের ১৫ কোটি, ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনালের ১৫ কোটি, দ্য পাঠান জুট ট্রেডিংয়ের ১৫ কোটি, আলমগীর জুট ট্রেডিংয়ের ১৪ কোটি, আবির জুট ট্রেডিংয়ের ১৩ কোটি, আজাদ ব্রাদার্সের ১৩ কোটি ও এমআর জুট ট্রেডিংয়ের কাছে ১২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে সোনালী ব্যাংকের।

প্রভাবশালী মহলের তদবিরে সম্প্রতি ২৩১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের ওপর তৃতীয় দফায় ব্লকড সুবিধা পেয়েছেন খুলনার সাত পাট ব্যবসায়ী। এ ব্যবসায়ীদের খেলাপি ঋণ ব্লক করে নতুন করে ৭১ কোটি টাকা বিতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সৌভাগ্যবান এ গ্রাহকরা হলেন মো. সিরাজুল ইসলাম, এসআর জুট ট্রেডিং, বেঙ্গল জুট ট্রেডিং, নক্ষত্র জুট ট্রেডিং ও পিআর জুট ট্রেডিং।

সূত্রমতে, সোনালী ব্যাংক খুলনা জিএম কার্যালয়ের অধীনে ছয়টি জেলার ১২৩টি শাখা রয়েছে। এ শাখাগুলো থেকে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে মোট ৪ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা সোনালী ব্যাংকের মোট ঋণের ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। খুলনা জিএম কার্যালয়ের অধীনে খেলাপি ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। এছাড়া স্বাভাবিক পন্থায় আদায় অযোগ্য হওয়ায় অবলোপন করা হয়েছে ৩০১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। সব মিলিয়ে সোনালী ব্যাংকের খুলনাঞ্চলের ১২৩টি শাখার খেলাপি ঋণের মধ্যে ৯০ শতাংশই পাট ব্যবসায়ীদের দেয়া ছয়টি শাখায় সৃষ্ট। সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি শাখার মধ্যে চারটিই খুলনার। এর মধ্যে খুলনার করপোরেট শাখায় ৮১২ কোটি, দৌলতপুর করপোরেট শাখায় ৪৭১ কোটি, দৌলতপুর কলেজ রোড শাখায় ৩৪৩ কোটি ও খালিশপুর শাখায় ৭১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। বণিকবার্তা

 

আজকের প্রশ্ন

খুলনা সিটি নির্বাচনের ভোটকে ‘প্রহসন’ বলেছেন বিএনপি ও বামপন্থিরা। আপনি কি একমত?