শনিবার, ২৩ জুন ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮, ১০:০৫:৪২

বাংলা ভাষার দেশ সিয়েরা লিওন

বাংলা ভাষার দেশ সিয়েরা লিওন

ঢাকা : বাংলা ভাষার মর্যাদা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈরিতার সূত্রপাত হয়। এর অন্যতম কারণ ছিল মাতৃভাষা। পূর্ব পাকিস্তানের মাতৃভাষা বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের (বর্তমান পাকিস্তান) উর্দু। অতঃপর ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সফর উপলক্ষে আয়োজিত একটি বিশাল সমাবেশে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ আর এ ঘোষণার পরই শুরু হয় মাতৃভাষা বাংলার জন্য বাংলার জনগণের তুমুল আন্দোলন।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি, বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ হারালেন দেশের চার শ্রেষ্ঠ সন্তান বরকত, রফিক, সালাম ও জব্বার। মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিই ছিল তাদের অপরাধ। সেই মহান ও গুরুত্ববহ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লো গোটা পৃথিবীতে। একটা সময় ২১ ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' ঘোষণা করলো জাতিসংঘ। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা-ভাষীর মানুষ মায়ের ভাষাকে সম্মান জানানোর সুযোগ পেলেন। বাংলা ভাষার মাহাত্ম্য চর্চিত হলো বিশ্বজুড়ে। ঠিক অর্ধ শতাব্দী পর আবারো বাংলা ভাষাভাষীদের আনন্দ উদযাপনের উপলক্ষ সৃষ্টি হলো। ২০০২ সালে আমাদের ভাষা আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হয়, ঠিক ওই বছরই বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ সিয়েরা লিওন বাংলা ভাষাকে তাদের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেয়।

জাতিসংঘ শান্তি মিশনের অংশ হিসেবে সিয়েরা লিওনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রেরণের মাধ্যমে দু’দেশের সম্পকেরর্ও অনেক উন্নতি ঘটে। উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে সিয়েরা লিওন স্বাধীনতা পায়। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর পর দেশটিতে দুর্নীতি, অপশাসন, অযোগ্যতার কারণে দেশে অরাজকতার সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। ১৯৯১ সাল থেকে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো সিয়েরা লিওনের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নেয়। বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে যোগ দেয়। বাংলাদেশ থেকে ৭৭৫ জন সেনার প্রথম দলটি সিয়েরা লিওনের দক্ষিণ অঞ্চলে লুঙ্গি নামক স্থানে দায়িত্ব নেয়। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ থেকে আরও সেনা সিয়েরা লিওন যান এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ হাজার ৩০০ জন সেনা একত্রে সিয়েরা লিওনে কর্মরত ছিলেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশ দল ২০০৫ সালে ফিরে আসে।

বাংলাদেশ সেনাদল তাদের নিয়মিত সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনার জন্য বিদ্যমান বিভিন্ন জাতির মধ্যে আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সাধারণ সেনারা ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষাও ব্যবহার করতে থাকেন। বাংলা ভাষা স্থানীয় লোকজনের অপরিচিত হওয়ায় বাঙালি সেনারা তাদের ধৈর্‍্য্যের সঙ্গে তা শেখাতে শুরু করেন। সাধারণ মানুষ বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করে খুব আগ্রহের সঙ্গে। ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তারা বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হতে থাকে। লক্ষ করা যায়, ২০০২ সালের মধ্যে যেখানেই বাংলাদেশি সেনাদল আছে, সেখানেই স্থানীয়রা বিশেষত তরুণ-তরুণীরা বাংলায় কথা বলতে পারছে। বিভিন্ন সভায় স্থানীয়রা বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয়দের বাঙালি নাচ ও গান পরিবেশন করতে দেখা যায়। বাংলাদেশ সেনাদলের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষা জনপ্রিয়তা পায়। স্থানীয়রা কাজ চালানোর মতো বাংলা ভাষা শিখে নেওয়ার ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দেশ পুনর্গঠনে বাংলাদেশ সেনাদল অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়।

সিয়েরা লিওনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ৩১টি দেশের সেনাদল কর্মরত ছিল। প্রায় প্রতিটি দেশের সেনাদল যুদ্ধরত বিভিন্ন বিদ্রোহী দলের আক্রমণের মুখোমুখি হলেও বাংলাদেশ সেনাদল এ বিষয়ে ছিল ব্যতিক্রম কারণ, বাংলাদেশি সেনাদল তাদের দায়িত্বের প্রতি সব সময় নিষ্ঠাবান ছিল, উপরন্তু সাধারণ মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করত। ফলে বাঙালি সেনাদের বাংলা ভাষাকে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচারের উদ্যোগটি সহজেই সফলতা পায়।

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভূমিকায় মুগ্ধ হয়ে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সিয়েরা লিওন সরকার বাংলা ভাষাকে সে দেশের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমাদ তেজান কাব্বাহ বাংলাদেশ সেনাদলের নির্মিত একটি ৫৪ কিলোমিটার সড়ক উদ্বোধনকালে এই ঘোষণা দেন। বাংলাদেশ ও ভারতের কয়েকটি রাজ্য বাদে আর কোথাও বাংলা ভাষা সরকারি ভাষা হিসেবে এই প্রথম স্বীকৃতি পায় আমাদের সেনাবাহিনীর কর্মতৎপরতায়। আমরা যখন ফেব্রুয়ারিতে নিজ দেশে বাংলা ভাষাকে মর্যাদা জানাই, তখন সিয়েরা লিওনেও আমাদের মায়ের ভাষা সমমর্যাদা লাভ করে। গোটা বিশ্বজুড়ে যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পালিত হয়, তখন সবাই মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের মায়ের ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। গোটা বিশ্বের সব দেশ ও মানুষের সঙ্গে তখন আমাদের এক অটুট বন্ধন স্থাপিত হয়।



আজকের প্রশ্ন