বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

বুধবার, ০৬ জুন, ২০১৮, ১০:১০:৩০

হঠাৎ আলোচনায় জাতীয় সরকার

হঠাৎ আলোচনায় জাতীয় সরকার

ঢাকা: বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় যে রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে তার সমাধান হিসেবে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি অনির্বাচিত 'জাতীয় সরকার' গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে দ্বিতীয় সারির রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা।

এরমধ্যে রয়েছে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, গণফোরাম, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্য।

এসব দল আগে থেকে অনির্বাচিত জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলে আসছিল। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এতে সাড়া না দেয়ায় তেমন একটা পাত্তা পায়নি জাতীয় সরকারের প্রস্তাব।

কিন্তু সম্প্রতি প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতাদের উপস্থিতিতে বিকল্পধারার প্রধান ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছেন।

গত ১৯ মে রাজধানীর ইস্কাটনের লেডিস ক্লাবে রাজনৈতিক নেতাদের সম্মানে বিএনপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলে হাজির হয়ে সর্ব প্রথম জাতীয় সরকারের বিষয়ে ইঙ্গিত দেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

এদিন তিনি বলেন, ‘আজকে চিন্তা করে দেখুন, এখানে বেশিরভাগ বিএনপি নেতারাই আছেন, কর্মীরা নেই। আজকে কর্মীদের বুক কাঁপে, ভয়ে দুরু দুরু। কাঁপবে না কেন? কারণ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা শঙ্কিত, কী হবে যদি আবার সরকারি দল ক্ষমতায় আসে? অভিজ্ঞতা বলে যে, খুব সুবিধা হবে না। একইভাবে সরকারের রাজনৈতিক কর্মীরাও আমার কাছে আসছে, তাদেরও বুক কাঁপে। যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে তাদের কী হবে! এটা কি খুব ভালো কথা? এটা কি রাজনীতির জন্য শুভ? এটা কি দেশের ভবিষ্যতের জন্য শুভ? এটা কি ইঙ্গিত নয় যে, ভবিষ্যতে এমন একটি পর্যায়ে যেতে পারে দেশ, যেখানে মানুষ মানুষকে হত্যা করবে, নিগৃহীত করবে, জেলে দেবে, আগুন জ্বালাবে। এটা কি সম্ভব? এটা কি ভালো জিনিস? কিন্তু থামাবে কে? চিন্তার খোরাক দিয়ে দিলাম।’

এরপরই তিনি বলেন, ‘এমন একটা শক্তি দরকার যে ওদিকেও (আওয়ামী লীগ) কন্ট্রোল করতে পারে, আবার এদিকেও (বিএনপি) কন্ট্রোল করতে পারবে। তারা যদি উঠে আসতে পারে এবং বলে, তোমরা যদি একটা মানুষের গায়ে হাত দাও তাহলে তোমাদের প্রতি সমর্থন উইথড্রো করব, বিরোধী দল হয়ে যাব। এদেরও বলবে, ওদেরও বলবে। একমাত্র তাহলেই দেশ রক্ষা পেতে পারে।’

সাবেক রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনেকেই বলাবলি করেন তিনি অসাংবিধানিক কোনো শক্তির ক্ষমতা দখলের কথা বলছেন কি না। পরে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানান বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

এর ১০ দিন পর গত ২৯ মে রাজধানীর গুলশানের অল কমিউনিটি ক্লাবে বিকল্পধারা বাংলাদেশের ইফতার অনুষ্ঠানে সরাসরি জাতীয় সরকারের কথা বলেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

ওই অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘আজকে যে সংকট এই সংকট কোনো ব্যক্তির বা দলের নয়। এই সংকট সমস্ত দেশের, সমস্ত জাতির। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে ছোটখাটো সমস্যা দূর করে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।’

ফখরুলের এই আহ্বানের পর বক্তৃতা দিতে এসে জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি বলেন, জাতীয় সরকার হলে দেশে সহিংসতা হবে না, আগুন জ্বলবে না, অন্যায়-অবিচার হবে না। তিনি বলেন, দেশের সব মেধাবী লোক একত্র হতে পারলে বাংলাদেশ আরেকটা সুযোগ পাবে। ঝগড়া–বিবাদ কমে যাবে। জাতীয় সরকারের বিষয়ে তার প্রস্তাব বিবেচনায় নিতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানান বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

বিকল্পধারার এ অনুষ্ঠানের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন শুরু হয়েছে যে, জাতীয় সরকার গঠনের এজেন্ডায় বিএনপি নেতারাও শামিল হচ্ছেন। আর আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে যেসব মেরুকরণ হতে যাচ্ছে তাতে জাতীয় সরকার গঠনই হতে পারে বিরোধী দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য।

তবে সুষ্ঠুভাবে বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কটকে জাতীয় সরকার গঠনের সমাধানে উন্নীত করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এর বড় কারণ হলো, জাতীয় সরকার গঠনের পুরো বিষয়টি ধোয়াশাপূর্ণ। বিশেষ করে অনির্বাচিত-অসাংবিধানিক জাতীয় সরকারের গঠন প্রক্রিয়া, নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব, লক্ষ্য ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় সরকারের প্রস্তাবকরা স্পষ্ট করে কিছুই বলছেন না।

আর এই অস্পষ্টতার কারণে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জাতীয় সরকার শেষ পর্যন্ত ওয়ান ইলেভন সরকারেরই নতুন সংস্করণ, যেখানে আগের সেনাসমর্থিত সরকারের নেতৃত্বে ছিল সুশীল সমাজ, সেখানে জাতীয় সরকারে নেতৃত্বে থাকবেন রাজনৈতিক নেতারা। কিন্তু আগের মতোই কর্তৃত্ব থাকবে সরকারের নেপথ্য শক্তির হাতে।

সেক্ষেত্রে, ওয়ান ইলেভেনের সরকার দুর্নীতি দমন ও রাজনৈতিক সংস্কারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের কথা বললেও কার্যত দেশের অর্থনীতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করা ছাড়া আর কোনো কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি। বরং অনির্বাচিত-অসাংবিধানিক শক্তি হওয়ার কারণে ওই সরকার বিদেশী মদদের ওপর দেশকে নির্ভরশীল করে পুরনো রাজনৈতিক শক্তির একাংশকে সীমাহীন কর্তৃত্ব অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক দিকে থেকে অত্যন্ত দুর্বল শক্তির অধিকারী-এমন দলের নেতাদের নেতৃত্বে জাতীয় সরকার গঠন বাংলাদেশের জন্য কতটা কল্যাণ বয়ে আনবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

কাজেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে একটি একপেশে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করলেও সঙ্কটকে সামনে রেখে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য সংগ্রামের পরিবর্তে অগণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠনের আন্দোলন গড়ে তোলা এবং এতে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গভীর অনিশ্চয়তাপূর্ণ।

বিশেষ করে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার বিদ্যমান সাংবিধানিক বাস্তবতার মধ্যে আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে অসাংবিধানিক সরকার গঠনের প্রচেষ্টা বানচালের চেষ্টা করলে তা গণসম্পৃক্ততাহীন রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

 



আজকের প্রশ্ন