মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ০৮ জুন, ২০১৮, ০৯:২৭:৪৭

এগিয়ে মিয়ানমার পিছিয়ে আমরা

এগিয়ে মিয়ানমার পিছিয়ে আমরা

ঢাকা: মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশের সামনে বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। ধারণা করা হয়েছিল, বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় দ্রুতই সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে দেশ। কিন্তু জ্বালানি বিভাগ এবং বাংলাদেশ তেল গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) অদক্ষতায় এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ-সীমান্তবর্তী তাদের সমুদ্র ব্লকগুলো থেকে মিয়ানমার গ্যাস উত্তোলন শুরু করে দিলেও বাংলাদেশ নিজেদের

ব্লকে এখনো পর্যন্ত সার্ভে বা জরিপ কাজই শুরু করতে পারেনি। প্রায় ছয় বছর পর এখন সমুদ্রে মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভের প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা।

  সমুদ্রে সার্ভে বা জরিপ করার বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়, গভীর সমুদ্রে মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভের উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধি বিশেষ আইনে মাল্টিরোল অফশোর সার্ভে ও গবেষণা জাহাজ কেনার চেষ্টা করা হয়েছিল। জ্বালানি বিভাগের জাহাজ কেনার উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি মেলেনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল, ব্যয়বহুল সার্ভে জাহাজ না কিনে ভাড়া করে জরিপ কাজ সম্পন্ন করা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও জ্বালানি বিভাগ বা পেট্রোবাংলার তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।

সমুদ্র সম্পদ ব্যবহার বা সমুদ্রের তেল গ্যাস অনুসন্ধানের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ  বলেন, আমরা সমুদ্রের সম্পদ সার্ভের জন্য জাহাজ ভাড়া করব। এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের মতামত চাওয়া হবে। জাহাজ ভাড়া হলে সার্ভে শুরু হবে।

এই যখন বাংলাদেশের অবস্থা, তখন প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী তাদের সমুদ্র ব্লক থেকে ইতোমধ্যে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে দিয়েছে। বাংলাদেশের ডিএস-১২ ব্লকসংলগ্ন এডি-৭ ব্লকে কোরীয় কোম্পানি দাইয়ু কর্তৃক জরিপ কাজ শেষ করে ৪ দশমিক ৫৩ টিসিএফ গ্যাসের মজুদ নিশ্চিত করেছে মিয়ানমার। এ ছাড়া বাংলাদেশের এসএস-১১ ব্লকসংলগ্ন এডি-৬ ব্লক চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (সিএনপিসি) কোম্পানিকে ইজারা দিয়েছে দেশটি।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ব্লকগুলো মিয়ানমারের আশপাশের ব্লকগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত এবং ভৌগোলিকভাবে একই গ্যাসের আধার। তাই বাংলাদেশের সীমানায় থাকা গ্যাস মিয়ানমার কর্তৃক উত্তোলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে অনেক পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কাজ শুরু করে দেওয়া উচিত।

ছয় বছরে বাংলাদেশের অগ্রগতি

সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরে প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দেশের মূল আয়তনের প্রায় ৮২ শতাংশের সমান। এ বিশাল সমুদ্র সম্পদ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি খুব বেশি নয়। গত বছরের ৫ জানুয়ারি একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি অস্থায়ী ব্লু-ইকোনমি সেল গঠন করা হয়। এ সেলের জনবলও খুব বেশি নয়। ব্লু-ইকোনমি সেলের সঙ্গে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে লিড মন্ত্রণালয় বিবেচনায় নিয়ে ১৭টি মন্ত্রণালয় ও ১২টি সংস্থাকে যুক্ত করা হয়। দফায় দফায় বৈঠক ছাড়া এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই ব্লু-ইকোনমি সেলের। এ ছাড়া পেট্রোবাংলা ২০১২ সালের প্রোডাকশন, শেয়ারিং, কনট্রাক্টের (পিএসসি) আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাপেক্স এবং ভারতের ওএনজিসি ভিদেশ অয়েল ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যকার যৌথ চুক্তির (জেবিএ) আওতায় এসএস ০৪ এবং এসএস-০৯ এ দুটি ব্লক; সান্তোস ক্রিশ এনার্জি ও বাপেক্সের যৌথ চুক্তিতে এসএস-১১ ব্লক এবং দাইয়ু পোসকোকে ডিএস-১২, ডিএস-১৬ ও ডিএস-২১ ব্লক ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে সান্তোসের কূপ খনন নিয়ে ইতোমধ্যে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। সান্তোস কূপ খনন করে গ্যাস না পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে। ওএনজিসি এখনো কাজ করছে।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, সমুদ্রের সম্পদ কাজে লাগাতে নানা তৎপরতা অব্যাহত আছে। গভীর সমুদ্রের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে দেশের অগ্রগতি অব্যাহত রাখা হবে। এখন প্রয়োজন যথাযথ গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কার্যকর অবদান। তিনি বলেন, খুব দ্রত সময়ের মধ্যেই সার্ভের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও দিক নির্দেশনার অভাবে সমুদ্রের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত একটি তথ্যবহুল জরিপ বা সার্ভে পর্যন্ত করতে পারেনি বাংলাদেশ। অথচ একই সময়ে ভারত ও মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরে বিপুল জ্বালানি সম্পদের সন্ধান পেয়েছে; গ্যাস উত্তোলন করছে। তিনি আরও বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে খনিজ সম্পদ উত্তোলনে পিছিয়ে পড়ছে দেশ। দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে গ্যাস নেই। ফলে আমদানিনির্ভর ব্যয়বহুল এলএনজির মতো জ্বালানি আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ। অথচ সঠিকভাবে এখনো দেশের গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধানের উদ্যোগই গ্রহণ করা হয়নি।

বদরুল ইমাম আরও বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সবগুলো ব্লকে কাজ শুরু করেছে মিয়ানমার। আর সেখানে বাংলাদেশের ব্লকগুলো ফেলে রাখা হয়েছে। মিয়ানমার পুরোদমে উত্তোলন শুরু করলে ঝুঁকির মুখে পড়বে বাংলাদেশের ব্লকগুলো। যদি ভূ-গঠন একই হয় সে ক্ষেত্রে মিয়ানমার গ্যাস উত্তোলনে বাংলাদেশের ব্লকগুলোর গ্যাসও চলে যেতে পারে।

এদিকে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের গ্যাস ব্লকগুলো থেকে মিয়ানমার গ্যাস উত্তোলন করছেÑ এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রায় তিন বছর আগে সরকারকে নজরদারি করতে চিঠি দেয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছিল, মিয়ানমার বাংলাদেশের মূল্যবান গ্যাস বা খনিজ সম্পদ আহরণ করছে কিনা, তা বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

চিঠিতে আরও বলা হয়, সমুদ্রে মিয়ানমারের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের গ্যাস ব্লকগুলো। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমুদ্রসীমায় চারটি ব্লক সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। মিয়ানমার দ্রুততার সঙ্গে রাখাইন রাজ্যভুক্ত গভীর সমুদ্রের গ্যাস উত্তোলনের কাজ শুরু করেছে। এ জন্য বাংলাদেশেরও অবিলম্বে সমুদ্র সীমান্তবর্তী এলাকায় গ্যাস উত্তোলনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এমন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পরও কার্যক্রমে তেমন অগ্রগতি নেই জ্বালানি বিভাগের।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে এখন প্রচ- জ্বালানি সংকট চলছে। বিশেষ করে গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের শিল্প খাত। দেশে প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে উত্তোলন হচ্ছে ২৭শ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের এ ঘাটতি মেটাতে সরকার বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি শুরু করেছে।আস



আজকের প্রশ্ন