বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

সোমবার, ২০ আগস্ট, ২০১৮, ১১:৫৬:৫৮

সরকারের প্রতি জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ!

সরকারের প্রতি জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ!

কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে প্রায় প্রতিদনই দেশের কোথাও না কোথাও আন্দোলনকারীদের আটক ও নির্যাতন করা হচ্ছে। অভিযোগ আছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সরকারি দলের নেতাকর্মী ও তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা শিক্ষার্থী, আন্দোলনকারী ও অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের আটক করে নির্যাতন শেষে পুলিশের কাছে সোপর্দ করছে। সরকার ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা সাধারণ আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার বা হয়রানি করবে না বলে বার বার ঘোষণা দিলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রেফতার ও হয়রানি অব্যহত আছে। সরকার ও প্রশাসনের এমন দ্বিচারিতায় দেশের সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থী, অভিভবকসহ ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে। দিন দিন এই ক্ষোভ ব্যপক থেকে ব্যাপক আকারে বাড়ছে। বিশিষ্ট নাগরিকদের অনেকেই রাষ্ট্রের এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে নানা বিবৃতি দিয়েছেন। একইভাবে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে গ্রেফতারবিরোধী প্রতিবাদী আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত আছে। দেশের সচেতন ছাত্র সমাজ, শিক্ষক, অভিভাবক, রাজনৈতিক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মীসহ সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গ্রেফতার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশে বিদেশে বিবৃতি ও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। সর্বশেষ দেশের এমন ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকার, প্রশাসন যন্ত্র ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে গত বুধবার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার পর মুশফিক বাবু নামে ঢাবির ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন বলে তার বন্ধুরা অভিযোগ করে। নিহত মুশফিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাবা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা বলে জানা গেছে।

নিহত মুশফিকের বন্ধ ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকালে দেশের শিক্ষা ও শাসন ব্যবস্থার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন মুশফিক। স্ট্যাটাসের শেষে মুশফিক মাহবুব লেখেন, ‘আই ওয়ান্ট ফ্রিডম অ্যাজ এ বাংলাদেশি ইভেন ইফ ইট কিলস মি ফর দ্য রিজন।’ বন্ধুরা জানান, ‘সে খুব স্বাধীনচেতা ছিল। কেউ ডিপ্রেশনে ভুগলে তাকে সে কাউন্সেলিং করতো। তার তেমন কোনো আর্থিক সমস্যা ছিল না। তবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর তার ক্ষোভ ছিল। প্রায়ই আড্ডায় সে ক্ষোভ প্রকাশ করতো। তবে কী কারণে সে আত্মহত্যা করেছে তার সঠিক কারণ বন্ধুরা জানাতে পারেননি।’

মুশফিকের স্ট্যাটাসে দেখা যায়, বুধবার সকাল ৯টা ৪৯ মিনিটে তিন শেষ পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে মুশফিক লিখেছেন, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত শাসন ব্যবস্থায় কিছু বলার ন্যুনতম অধিকার থাকে না। এখন এটা বোঝার সময় হয়েছে যে, তোমার কন্ঠস্বরের কোন মূল্য নেই। তাই কথা বলা বন্ধ করুন ও সরকারের ভৃত্য হিসেবে তাদের প্রশংসা করা শুরু করুন। কি করতে হবে এবং কি করা যাবে না, শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদেরকে তা বলে দেয়। যেন সমাজ আমাদেরকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যে সমাজ আমাদেরকে জেলে পাঠানো বা হত্যা করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি আমাদের মৃতদেহ এমন জায়গায় ছুড়ে ফেলার ক্ষমতা তাদের আছে, যেখান থেকে কেউ তা খুঁজে পাবে না। এ বিষয়ে আপনাদের অনুভূতি কি? কে তাদেরকে এই ক্ষমতা দিয়েছে? গণতন্ত্র? নাকি এটা গণতন্ত্রের নামে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ, যেখানে আমাদেরকে ক্ষমতাসীনদের প্রশংসা করতে হবে, তাদেরকে মেনে চলতে হবে। এটা কি শুধু আপনাদের হাতে বন্দুক আছে বলে? এটাই বিশ্বের সব ক্ষমতা না। বাংলাদেশী হিসেবে আমি স্বাধীনতা চাই। এমনকি এই চাওয়ার জন্য তারা যদি আমাকে হত্যা করে, তাও আমি এটা চাই।’

শিক্ষার্থীসহ নাগরিকদের ক্ষোভের মধ্যেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতার অব্যাহত আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার রাতে ফারিয়া মাহজাবিন (২৮) নামে এক নারীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। গতকাল তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। গ্রেফতার হওয়া নারী ধানমন্ডির নার্ডিবিন কফি হাউসের অন্যতম মালিক তিনি। র‌্যাব জানায়, বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনার পর ‘নিরাপদ চড়ক চাই’ আন্দোলন চলাকালে ফারিয়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংহতি প্রকাশ করে ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা, বানোয়াট ছবি, গুজব সংবাদ, বানোয়াট ভিডিও ভাইরাল, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য বিভ্রান্তমূলক স্ট্যাটাস দিতেন। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ছাত্রদের সব দাবি মেনে নিলেও অন্য সহযোগীদের নিয়ে অন্যায়ভাবে বিক্ষোভ কর্মসূচি পরিচালনা এবং রাস্তায় সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করার উদ্দেশ্যে অপতৎপরতা করে আসছে বলে র‌্যাব জানায়।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার ইসলামী ছাত্রশিবির সন্দেহে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় মো. ইয়াকুব হোসেন নামের এক কলেজ শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে ছাত্রলীগ। ইয়াকুব হোসেন পটুয়াখালী সরকারী কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি গলাচিপা উপজেলার পানখালী এলাকায়। ঘটনার পর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, নাশকতার পরিকল্পনা করা অবস্থায় পটুয়াখালী জেলা ছাত্রশিবিরের সাধারণ স¤পাদক ও রাঙ্গাবালী উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ইয়াকুব হোসেনকে ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে হাতেনাতে ধরে ফেলে। পরে তাকে হালকা মারধর করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে পুলিশের কাছে আটক ইয়াকুব ছাত্রশিবিরের সঙ্গে স¤পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে বেড়াতে আসলে ছাত্রলীগের নেতারা আমাকে ছাত্রশিবিরের নেতা বলে মারধর করে পুলিশে দেয়।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতারের পাশাপাশি ভুক্তভোগীসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রতিবাদ অব্যাহত আছে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রখ্যাত ফটোসাংবাদিক শহীদুল আলমসহ কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে মানবন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। গ্রেফতদার হওয়া শিক্ষার্থীদের পরিবার ও মানবাধিকার কর্মীরা ‘ভুক্তভোগী পরিবার’ এর ব্যানারে এ কর্মসূচির আয়োজন করে। কর্মসূচি থেকে কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারীদের নি:শর্ত মুক্তি দাবি করা হয়। এসময় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চলাকালীন সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তিও দাবি করা হয়। মানববন্ধনে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানের মা সালেহা বেগম, আরেক নেতা তারিকুল ইসলামের বাবা শফিকুল ইসলাম, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক লুৎফুন্নাহার লুনাকে গ্রেফতার ও রিমান্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল সেগুনবাগিচার বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসেসিয়েশনে (ক্র্যাবে) এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এ দাবি জানায়। বক্তরা বলেন, গোলাপী রঙের একটি জামা পরিহিত অবস্থায় একটি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেওয়ার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যা স্পষ্ট অন্যায় ও সংবিধানের লংঘন। এছাড়া ক্র্যাবে সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমানকে ফিরিয়ে দিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন হাসিনুরের স্ত্রী শামীমা আক্তার।

 



আজকের প্রশ্ন