মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

সোমবার, ০৮ জানুয়ারী, ২০১৮, ০৫:৫১:৫৯

গণতন্ত্রের এক ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ ইতিহাস

গণতন্ত্রের এক ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ ইতিহাস

কাদের গনি চৌধুরী
৫ জানুয়ারি গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় দিন। ২০১৪ সালের এই দিনে আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের সেবাদাস নির্বাচন কমিশন যৌথভাবে একতরফা ও একদলীয় ভোটহীন, ভোটারবহীন, প্রহসনের নির্বাচনের নামে গণতন্ত্র হত্যা করেছিল। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছিল। প্রশ্নবিদ্ধ এ নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
 
দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ সরকার বন্দুকের নলের মুখে নির্বাচনের নামে তামাশার মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে। শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্ব গণতন্ত্রের ইতিহাসে নির্বাচনের নামে এমন তামাশা ছিল নজিরবিহীন।
 
এই নির্বাচনকে কেউ অভিহিত করেছেন ‘ধোঁকাবাজির নির্বাচন’, কেউ ‘গণতন্ত্রের ট্রাজেডি’, কেউ বলেছেন ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’ আবার কেউ বলেছেন, শতাব্দীর ঘৃণ্যতম ‘নির্বাচনী প্রহসন’। এছাড়াও নানা নামে এ নির্বাচনকে অভিহিত করেছেন লেখক, সাংবাদিক ও রাজনীতিকরা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘ভাওতাবাজির নির্বাচন‘,  ‘ভোট ডাকাতির নির্বাচন’, ‘একদলীয় নির্বাচন’, ‘একতরফা নির্বাচন’, ‘বিশ্বের সেরা প্রহসনের নির্বাচন’,  ‘প্রতারণার নির্বাচন’,  ‘ভাগাভাগির নির্বাচন’,  ‘অর্থহীন ও হাস্যকর নির্বাচন’, ‘ভোটাধিকার হরণের নির্বাচন’, ‘আস্থাহীনতার নির্বাচন’, ‘নীল নকশার নির্বাচন’, ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’, ‘ক্ষমতা দখলের নির্বাচন’, ‘কলংকময় প্রহসনের ঘৃণিত নির্বাচন’, ‘অগ্রহণযোগ্য ভোগাস নির্বাচন’, ‘রাবিশ নির্বাচন’, আরো কতকি। এমন কোন খারাপ বিশেষণ নেই যা এই নির্বাচনকে নিয়ে ব্যবহার হয়নি।
এই নির্বাচন এতই জঘন্য ছিল যে এই নির্বাচনকে একমাত্র ভারত ছাড়া বিশ্বের কোনো দেশ স্বীকৃতি দেয়নি ও ক্ষমতাসীন সরকারকে জনগনের  সরকার হিসেবে মেনে নেয়নি।
 
প্রহসনের অংশ হিসেবে এই নির্বাচনে ভোট ছাড়াই প্রথমে ১৫৩টি ও পরে ১টিসহ মোট ১৫৪টি অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বর্তমান ক্ষমতানীসরা ভোটের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হয়ে যান। ৫ জানুয়ারির ভোটের দিন বাকি ১৪৬টি আসনে গড়ে ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি। সেদিন নির্বাচন কেন্দ্রগুলোতে কুকুর, বিড়াল ঘুমিয়ে থাকার দৃশ্য দৈনিক পত্রিকার লীড ছবি হিসেবে ছাপা হয়। প্রচণ্ড সহিংসতাপূর্ণ এই নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোট গ্রহণের আগের দিন পর্যন্ত ৪১দিনে নিহত হয় ১২৩জন। আর ভোটের দিন সহিংসতায় মারা যায় ১৯জন। ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৪২ জন অর্থাৎ এত সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি এর আগে দেখা যায়নি। নির্বাচনের দিন ১১১টি ভোট কেন্দ্র জনগণ পুড়িয়ে দেয়। ৫৯টি কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি।
 
বাংলাদেশে এর আগে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ এরশাদের ভোট ডাকাতির নির্বাচন এবং ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাসের উদ্দেশ্যে। তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী কলংক আগের সব কলংককে ম্লান করে দিয়েছে। টেলিভিশন টকশোতে দেয়া বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের ভাষায়- ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি চিহ্নিত হয়ে আছে বাংলাদেশের তিনটি খারাপ নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ একটি নির্বাচন’ হিসেবে।
 
সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দেশী-বিদেশী সব আহ্বান-উদ্যোগ উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার সরকার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা এই নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একগুঁয়েমির নির্বাচন। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার মহাজোটের শরিক কয়েকটি দল ছাড়া অন্য কোনো দল অংশ নেয়নি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট, অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা, ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, প্রাচীন দল সিপিবি এবং আসম রবের জাসদসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই এ নির্বাচন বর্জন করেছিল।
 
৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি ছিল এমনই এক অদ্ভুত নির্বাচন, যে নির্বাচন ৩০০ আসনের মধ্যে ভোটের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যান অর্ধেকের বেশি প্রার্থী। দেশের ৫২ শতাংশের বেশি ভোটার তাদের ভোট  দেয়ার সুযোগটুকুও পাননি। অন্যদিকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যায় ক্ষমতাসীন দল। বাকি ১৪৬ আসনে ৫ জানুয়ারি হয়েছে আসন ভাগাভাগির নির্বাচনী প্রহসন। এ নির্বাচন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরই ভোট দেয়ার সুযোগ ছিল না। যাদের ভোট দেয়ার সুযোগ ছিল, তাদেরও সুযোগ ছিল না আওয়ামী লীগ বা তার অনুগতদের ছাড়া অন্য কোন প্রার্থীকে পছন্দ করা। এই নির্বাচনে ভোট দেননি প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং সিইসী কাজী রকিবউদ্দিন। কারণ তাদের এলাকায় ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়ে যান আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। তেমনি ভোট দেননি বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ও জাতীয় পার্টির নেতা এইচএম এরশাদ। এটা ছিল এমন একটা নির্বাচন, যে নির্বাচনের জন্য বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে তার বাড়ির সামনে বালুভর্তি ট্রাক ও জলকামান রেখে ব্যারিকেড দিয়ে গৃহবন্দি করা হয়। তেমনি এইচএম এরশাদকে র‌্যাবের প্রহরায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে আটকে রাখা হয়।
 
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিন সারা দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় সাড়ে চার লাখ সদস্যের উপস্থিতিতে ১১ জেলায় নিহত হয়েছে ১৯জন। এর মধ্যে ১৫ জনই পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। ভোটের দিন এত সংখ্যক মানুষের প্রাণহাণি এর আগে দেখা যায়নি। নির্বাচনের পরদিন নিহত হয়েছেন আরও ৩ জন। রেকর্ড সংখ্যক সহিংসতা, সীমাহীন হাঙ্গামা ও আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে ৬৯৭ কেন্দ্রে। ৫৩৯টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিতসহ ৮টি আসনে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। আবার সিল মেরে বাক্স ভর্তি করার কারণে এক মিনিটে ১৮টি ভোট পড়ার রেকর্ডও হয়েছে। ফাঁকা কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসাররা ব্যালেটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করেছেন। তেমিন বাধাহীনভাবে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা সবার সামনেই সিল মেরে বাক্স ভরেছে।
 
গণমাধ্যমে ‘বাপের বেটা’ হিসেবে আখ্যায়িত হন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর ছেলে, একাই ৪২২টি ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ফেলার জন্য। ভারত ও ভুটানের অখ্যাত চারজন পর্যবেক্ষক ছাড়া বিশ্বের সব দেশ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ থেকে বিরত থেকেছে। দেশের বেশিরভাগ পর্যবেক্ষকও এ নির্বাচনে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেনি। এত কম ভোটার এর আগে কোনো নির্বাচনে দেখা যায়নি। গুটি কয়েক আওয়ামী সমর্থক দেশীয় নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ সংস্থা এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে, তারাও নগণ্য ভোট পড়ার কথাই বলেছেন। নির্বাচনের দিন বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও অন্যান্য গণমাধ্যমে যে খবর দেয় তাতে বলা হয়, ৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়বে না। অধ্যাপক বি, চৌধুরী, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও আসম রব যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, এ নির্বাচনে ২ থেকে ২.৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। তবে রাতে নির্বাচন কমিশন থেকে প্রার্থীদের মার্কায় লাখ লাখ ভোট দেখানো হয়।
 
নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৪০.৫৬ শতাংশ ভোট পড়েছে। এটা যে ইসির সাজানো ঘটনা তার প্রমাণ নির্বাচন কমিশনের সূত্রে ভোটের আগের দিন পত্র পত্রিকায় যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় তাতে বলা হয় ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট দেখাতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেটিই বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে। আসন ভাগভাগির এ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ৮টি স্থগিত হওয়া ছাড়া বাকি ২৯২টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ভাগে ২৩২টি ও জাতীয় পার্টির ভাগে ৩৩টি দেখানো হয়।
 
দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বড় দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়া এই নির্বাচনে কেউ ছিল না। তাদের ১৪ দলীয় জোটে থাকার পরও প্রহসনের নির্বাচন থেকে সরে পড়েন এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। প্রহসনের নির্বাচনে না যাওয়ার অবস্থানে অটল থাকায় এরশাদকে ধরে নিয়ে গিয়ে সিএমএইচে রাখা হয়। এরশাদসহ জাপার অনেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলেও তা সরকারের বশংবদ নির্বাচন কমিশন তা গ্রহণ না করার ফলে জাপাকেও বেশ কিছু আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করা হয়। দলের একাংশকে রওশন এরশাদের মাধ্যমে ভাগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়।
 
এর আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ৪৯টি আসনে ৪৮ জন এবং ২০০৭ সালের বাতিল হওয়া ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৭ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে অর্ধেক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ তথা পাক-ভারত বা বৃটিশ-ভারতের ইতিহাসেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি বিশ্বে কোথায়ও এমন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ এমনই একটি নির্বাচন ‘উপহার’ দিয়েছে জাতিকে।
 
এরূপ নির্বাচন যেমন জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও নয়। জনগণকে এতটাই তারা ভয় পায় যে, একতরফা নির্বাচনেও হেরে যাওয়ার ভয় করেছিল আওয়ামী লীগ। এজন্য আগে থেকেই এই ম্যাকানিজম করে রাখা হয়। সেটা করতে গিয়ে বিগত সংসদ নির্বাচনের মতো ১০০% এর অধিক ভোট গ্রহণের মতো হাস্যকর অবস্থা দাঁড়ায়। স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগ বিশ্ববাসীর কাছে এরূপ একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে হেয় করেছে। স্বাধীনতার পর তারা দেশকে বিশ্বের সামনে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করেছিল। আর এবার তারা দেশের মর্যাদাকে হাস্যকর অবস্থানে নিয়ে যায় ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে।
 
দেশের জনগণ যেমন এই একতরফা নির্বাচনে সাড়া না দিয়ে আওয়ামী মহাজোটকে বয়কট করে, তেমনি বিদেশীরাও মেনে নেয়নি। জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফারনান্দেজ তারানকো সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বহু দৌড়ঝাঁপ করেও যখন ব্যর্থ হন, তখন আওয়ামী লীগ এই একতরফা নির্বাচন করে। ভারত ছাড়া কোনো দেশ এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়নি। কোন দেশ এই নির্বাচনের জন্য পর্যবেক্ষকও পাঠায়নি। এরূপ নির্বাচনের ফলে কার্যত আওয়ামী লীগ দেশকেই একঘরে করে ফেলে এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ মারাত্মক ইমেজ সঙ্কটে পড়ে। সেই সঙ্কট থেকে এখনো দেশকে বের করে আনতে পারেনি সরকার।
 
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ১৩ জানুয়ারি তারিখে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বিএনপির বৈঠক শেষে গুলশানের একটি হোটেলে সাংবাদিকদের বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা বলেন, গত ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র হতাশ। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ মতামত প্রকাশের সুযোগ পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র এখনো আশা করে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো শিগগিরই একটি সমঝোতায় আসতে পারবে। তিনি বলেন, বিএনপি হরতাল ও অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচি স্থগিত করেছে। এখন সরকারের উচিত হবে বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, সহিংসতা ও নৈরাজ্য দূর করতে হলে সরকারকে আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তেমনি হরতাল ও অবরোধ প্রত্যাহার করে বিএনপিকেও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মজিনা বলেন, সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণ দেখতে চায়। এর জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলকে আলোচনার মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
একই বৈঠক শেষে ইইউর আবাসিক প্রতিনিধি উইলিয়াম হানা সাংবাদিকদের বলেন, যে কোনো মূল্যে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। সহিংসতা কারো কাম্য হতে পারে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঢাকাস্থ আবাসিক প্রতিনিধি উইলিয়াম হানা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন চায় সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দেশের অধিকাংশ মানুষ ভোট দিতে পারেনি এবং তাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। এটা খুবই হতাশাজনক। তিনি বলেন, আমরা আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেছি এবং বিএনপির নেতৃবৃন্দের সাথেও সাক্ষাৎ করেছি। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন আয়োজনের জন্য সবাইকে সংলাপে বসতে হবে।
 
কানাডার রাষ্ট্রদূত হিজার ক্রুডেন বলেন, বাংলাদেশের জনগণ চাইলে এখনো সব দলের অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। কিন্তু বিএনপিকে হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতার পথ পরিহার করে আলোচনায় আসতে হবে। তেমনি সরকারি দল আওয়ামী লীগকেও আলোচনার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
১৩ জানুয়ারি বিকাল ৪টায় রাজধানীর গুলশানে হোটেল হেরিটেজে বৈঠক শুরু হয়। শেষ হয় বিকাল ৫টায়। বৈঠকে বিএনপির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মুবিন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, শফিক রেহমান। অপরদিকে বিদেশী কূটনীতিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আবাসিক প্রতিনিধি উইলিয়াম হানা। এছাড়া কানাডা, জার্মান, ব্রাজিল, ইটালি, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, স্পেন, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, ভ্যাটিকান, অস্ট্রেলিয়া, মরক্কো, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও নেদাল্যান্ডসের পক্ষে এ দেশগুলোর হাইকমিশনার, ডেপুটি হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূতরা এবং ব্রিটিশ পলিটিক্যাল সেক্রেটারি, পাকিস্তানের প্রেস সেক্রেটারি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
 
বাংলাদেশে বিরোধী দলের বয়কটের মুখে অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের ওপর আন্তর্জাতিক আর্থিক অবরোধ আসতে পারে বলে মনে করেছিল ভারত। এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে দৃঢ় থাকার জন্য বেশ কিছু জরুরি পরামর্শও দেন বলে কলকাতাভিত্তিক পত্রিকা আনন্দবাজার প্রতিবেদনে প্রকাশ করে। ওই সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে আশঙ্কা ব্যক্ত করে পত্রিকাটি লিখেছে, বৃটেন-আমেরিকা ও তাদের প্রভাবিত কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংগঠন বাংলাদেশে বিরোধীশূন্য নির্বাচনের সমালোচনা করে সব পক্ষকে নিয়ে ফের নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।
 
ভারত মনে করছে, এজন্য বাংলাদেশে নতুন সরকারের ওপর আর্থিক অবরোধও চাপাতে পারে পশ্চিমী শক্তি। ঘরে-বাইরে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হাসিনা সরকার যাতে দৃঢ়ভাবে হাল ধরতে পারে, সেজন্য হাসিনাকে বেশ কিছু জরুরি পরামর্শও দিয়েছেন মেনন।
 
প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা ও শিবশঙ্করের ফোনালাপ সম্পর্কে লেখা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেনন শেখ হাসিনাকে বলেন, সীমান্তের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করার প্রশ্নে ভারতের সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোই তার ওপর চাপ দিচ্ছে। কিছু দিন আগেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব অনিল গোস্বামী জরুরি বৈঠক করেছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের সঙ্গে। সেখানেই সীমান্ত সিল করে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
 
সূত্রের খবর, গত দুদিনে যশোর ও সাতক্ষীরায় হিংসার ফলে বেশ কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন সীমান্তের পাশে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক মনে করছে, এখনো বড় হারে অনুপ্রবেশ শুরু হয়নি ঠিকই, কিন্তু হাসিনা সরকার যদি কঠোর হাতে পরিস্থিতির মোকাবিলা না করতে পারে, তা হলে ভারতের ওপর চাপ অনেকটাই বাড়বে। এর মোকাবিলায় ভারতের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পরামর্শ মেনন দিয়েছেন হাসিনাকে।
 
আনন্দবাজার লিখেছে, মালদহের (দক্ষিণ) সংসদ সদস্য তথা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী আবু হাসেম খান চৌধুরী ডালুও আজ বাংলাদেশ-পরিস্থিতি নিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন কেন্দ্রকে। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশে যে সন্ত্রাস তৈরি হয়েছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আতঙ্ক বাড়ছে। তার বক্তব্য, কেন্দ্র অবিলম্বে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরো সঙ্কটজনক হবে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনকে এ ব্যাপারে সজাগ করে দেয়ার অনুরোধও কেন্দ্রকে করেছেন ডালু বাবু। ফোনে তার সঙ্গে শিবশঙ্কর মেননেরও কথা হয়েছে। ডালু বাবুর কথায়, মেনন আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশের সঙ্গে তারা সঠিক লাইনেই কথা বলছেন।
 
তৎকালীন সিইসী কাজী রকিবউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশনকে আজ্ঞাবাহী কমিশন হিসেবে বিরোধী দল অভিযুক্ত করে আসছিল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যেভাবে তারা সম্পন্ন করেছে তাতে বিরোধী দলের অভিযোগই সত্য প্রমাণিত হয়। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে ইসি ব্যর্থই শুধু হয়নি, এমনই এক নির্বাচন তারা করেছে যা হাস্যকরও। সুজনের সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের ভাষায়-নির্বাচনের পরদিন এটাই বলার আছে যে, ‘অপারেশন সাকসেসফুল, বাট পেশেন্ট ইজ ডেড’। শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও একতরফা নির্বাচনের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।
 
বিবিসি বলেছে, বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি একতরফা যে বিতর্কিত নির্বাচনটি হয়েছে তাতে খুবই নগণ্য সংখ্যক ভোটার ভোট দিতে পেরেছেন। ১৫৩টি আসনে ভোট হয়নি। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিযোগিতার অভাবে একটি অদ্ভুত নির্বাচন হলো। বিশেষ করে বাংলাদেশে গতিশীল গণতন্ত্রের যে ঐতিহ্য রয়েছে, সেই বিবেচনায় ৩০০ আসনের সংসদে সরকারি দলের প্রার্থীরা অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা ভোটে জয়ী হয়ে বসে ছিলেন। এসব আসনে ভোট হয়নি। এর ফলে চিরি কোটি ৮০ লাখ ভোটারকে ভোট দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়।
 
টাইম সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনে বাংলাদেশী ভোটারদের সাড়া মেলেনি, সহিংসতা ও অসম্ভব কম উপস্থিতি জাতির রাজনৈতিক সঙ্কটের গভীরতাকে তুলে ধরেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে শতাধিক ভোট কেন্দ্রে আগুন দেয়া হয়েছে এবং পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করেছে। এই নির্বাচন বিরোধী দলগুলো বর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটিকে ‘সবচেয়ে ত্রুটিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছে।
 
বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল বর্জন করায় ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নির্বাচনটি করা হচ্ছে। কিছুদিন পর আরেকটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা হবে।
 
একইভাবে  এনির্বাচনকে নিয়মরক্ষার নির্বাচন এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন বলে উল্লেখ করেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। তবে  ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচনের পর মন্ত্রীত্বের শপথ নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েই তাদের সুর পাল্টে যায়। নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের দাবিকে তারা এখন আর আমলেই নিচ্ছে না। ২০১৯ সালের আগে কোন নির্বাচন নয়- এমন কথাই তারা বলছেন। অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যত কথাই থাকুক তারা যেন ৫ বছর পূর্ণ করবেই। শুধু তাই'ই একই কায়দায় আবারো ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করছে। তারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে সাজা দিয়ে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চাইছে।
 
অথচ ১০ম সংসদ নির্বাচনের ৪দিন আগে ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি বুধবার ধানমণ্ডিস্থ দলের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যলয়ে এক জরুরি সাংবাদিক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামো রক্ষার অত্যাবশ্যকীয় তাগিদে ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া বাস্তবসম্মত ও সংবিধানসম্মত কোনো বিকল্প নেই’। নির্বাচনের পর সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে প্রধান বিরোধীদলসহ সকল নিবন্ধিত দল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা আশা করি, ‘বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেবেন’।
 
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের একদিন আগে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, ‘দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার পর কোনো না কোনো সময় একাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সমঝোতার ভিত্তিতে একাদশ নির্বাচন হতে পারে।
 
নির্বাচনের ১ দিন আগে ৩ জানুয়ারি শুক্রবার সিলেটে গণমাধ্যমের কর্মীদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, নতুন সরকার পাঁচ বছর থাকবে বলে মনে করি না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলে যেকোনো সময় নতুনভাবে নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সরকারের ওপর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার এই দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। দশম জাতীয় সংসদ পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হচ্ছে কি না জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার পাঁচ বছর থাকবে বলে মনে করি না। নতুন সরকার গঠনের পর বিরোধী দলের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হলে যেকোনো সময় নতুনভাবে নির্বাচন করা যেতে যারে।
 
২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আলোচনার মধ্য দিয়ে যদি আমরা সমঝোতায় আসতে পারি, আর উনি যদি হরতাল-অবরোধ বন্ধ করেন, তাহলে সংসদ ভেঙে দিয়েও নির্বাচন দিতে পারি। নির্বচনের পরের দিন ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসনা গণভবন চত্বরে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘আগামী নির্বাচন সম্পর্কে আলোচনা করেই সমাধান করা হবে। সেজন্য সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে, সহনশীল হতে হবে এবং সব ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। ‘সহিংসতা ও জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে আলোচনায় আসুন।’
 
একই দিন ৬ জানুয়ারি সোমবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের দলীয় কার্যালয়ের সামনে ২২টি সংগঠনের সমন্বয়ে সম্মিলিত আওয়ামী সমর্থক জোটের ব্যানারে আয়োজিত হরতাল ও অবরোধবিরোধী এক মানববন্ধনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং তৎকালীন বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেও বিরোধী দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমঝোতায় যেতে রাজি আছে। তবে এ জন্যে বিরোধী দলকে অবশ্যই সন্ত্রাস, নাশকতা বন্ধ করতে হবে।
 
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ৭ জানুয়ারি ২০১৪ মঙ্গলবার বিকেলে ধানমণ্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকার আশপাশের কয়েকটি জেলার সভাপতি সাধারণ সম্পাদক এবং সংসদ্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি এটা বলা যাবে না। তবে নির্বাচন সর্বজনগ্রাহ্য হয়নি। বিরোধী দল এ নির্বাচনকে সীমাবদ্ধতা এনে দিয়েছে।’ মন্ত্রীত্বের শপথ নেয়ার পর এই ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ৫ বছর ক্ষমতায় থাকবো এমনটি অন্যদের মতো বলবো না।
 
১৫৪ আসনে বিনা ভোটে পাস ও ৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের পরই ক্ষমতাসীনদের এই সুর পাল্টে যায়। তারা এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা আর না বলে মনে করে যে, বিএনপি যেভাবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে তেমনি আগামীতেও এমন কোন আন্দোলন তারা সৃষ্টি করতে পারবে না যাতে সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হয় বা মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য করা যেতে পারে। দুই বছরের ব্যবধানে তাদের সেই কৌশল সফল হয়েছে বলেই মনে করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র বাম জোট।
 
সম্ভাব্য আন্দোলন সংগ্রামের সমুদয় রাস্তা বন্ধ করতে তারা অধিক হারে মামলা নির্ভর হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধের পরও সরকারকে নামানো যায়নি। বরং সরকার মামলার পর মামলা দিয়ে, ক্রসফায়ার, গণগ্রেফতারসহ চরম দমননীতি গ্রহণ করে বিএনপি-জামায়াতসহ বিশ দলীয় জোটকে বিধ্বস্ত করেছে। এতে তারা মনে করছে তারা সফল হয়েছে। তারা মনে করছে ৫ বছরই পূর্ণ করতে তাদের পথের কাঁটা হয়ে বিএনপি-জামায়াত দাঁড়াতে পারবে না। তাই এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকে শুধু উপেক্ষাই করছে না, আরেকবার কিভাবে ক্ষমতা  দখল করা যায় তা নিয়ে ফন্দি আঁটছে।
 
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব
 

আজকের প্রশ্ন

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বিএনপির নেতারা মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি করছে।’ আপনিও কি তাই মনে করেন?