শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০১৮, ১২:০০:১৬

শহীদ জিয়াউর রহমান : বাংলাদেশের সফল রাষ্ট্রনায়ক

শহীদ জিয়াউর রহমান : বাংলাদেশের সফল রাষ্ট্রনায়ক

খায়রুল কবীর খোকন
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান যেভাবে চট্টগ্রামের কালুরঘাট স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে এ জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন, একইভাবে পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের এই দেশের সরকার-প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্বভার পেয়ে বাংলাদেশ জাতি ও রাষ্ট্রের প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়েছিলেন। তিনিই এই দেশে একদলীয় ‘বাকশাল’-ব্যবস্থার পরে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন- পুরো জাতিকে মুক্ত করেছিলেন একদলীয় ব্যবস্থার অপসংস্কৃতি থেকে।

আজ (১৯ জানুয়ারি) বাংলাদেশের এ মহান নেতার ৮১তম জন্মদিন। মাত্র ৪৫ বছরের জীবনকালে জিয়াউর রহমান নিজেকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা-রূপে সুপ্রতিষ্ঠিত করে বাংলাদেশী জাতিরাষ্ট্রের লড়াকু-বীর হিসেবে এই জাতির মুক্তির পথ দেখিয়ে গেছেন অবিরাম। তিনিই এই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাকা প্রথম ঘুরিয়ে গেছেন প্রবল শক্তিমত্তা দিয়ে। তার দৈহিক শক্তির চেয়ে মানসিক শক্তি ছিল লাখোগুণ বেশি, দূরদৃষ্টি ছিল অসাধারণ, নজিরবিহীন।

ষাটের দশকে জিয়াউর রহমান একজন দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। একাত্তরের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার সময়ে তিনি চট্টগ্রামে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে ডেপুটি-কমান্ডার ও একজন চৌকস মেজর। তার অধিনায়ক লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী তার ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পাক সামরিক বাহিনীর আক্রমণে নিহত হন এবং তার অধীনস্থ প্রায় এক হাজার বাঙালি সেনাসদস্য মারা যান, তাদের মধ্যে অনেক অফিসারও ছিলেন। উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহামন তখন ঢাকা থেকে বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে থেকে যুদ্ধ শুরুর নির্দেশ পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তবে তিনি তার কমান্ডার লে. কর্নেল এম আর চৌধুরীর মতো নিষ্ক্রিয় ছিলেন না, পাক সামরিক বাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরুর লক্ষ্যে সদাপ্রস্তুত ছিলেন। ২৫ মার্চ মধ্য রাতে যেই মুহূর্তে ঢাকায় ও আশপাশে পাক সামরিক বাহিনী তার ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের যুদ্ধ আরম্ভ করে, সেই-মুহূর্তে কালবিলম্ব না করে মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে দেন। তার সাথে থাকা বাঙালি সামরিক অফিসার, এনসিও, জেসিও সবাই এবং বাঙালি সেনাসদস্য ও ইপিআর সদস্যরা সবাই প্রতিরোধ-লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

চট্টগ্রামে তখন বাঙালি সেনারা ও ছাত্র-শ্রমিক-যুবক-তরুণ সবাই, এমন কি প্রৌঢ়-বৃদ্ধ নারী-পুরুষও পাকিস্তানি দখলদার হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-লড়াইয়ে অংশ নেন- যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে। সমগ্র প্রতিরোধ যুদ্ধের সার্বিক নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তখনকার সর্বাপেক্ষা সিনিয়র বাঙালি সামরিক অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান- তখন তিনি ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার। কালুরঘাটে স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ প্রথমে নিজের নামে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, পরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাফল্যের বিবেচনায় রেখে সেই ঘোষণা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিুবর রহমানের পক্ষে ঘোষণার কথা জানান। বস্তুত, সেই ঘোষণাটি দিশেহারা বাঙালি-জাতিকে সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের পথ দেখিয়েছিল।

সারা দুনিয়ায় পাকিস্তানি বর্বর সামরিক বাহিনীর বাঙালি নিধনযজ্ঞ ও তার বিরুদ্ধে জিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধযুদ্ধের কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদেরকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে। সমগ্র বাঙালি-জাতির মধ্যে আশার আলো ছড়িয়ে পড়ে- বাঙালি একদিন স্বাধীন জাতিতে রূপান্তরিত হবে, প্রতিষ্ঠিত হবে বাঙালির নিজস্ব জাতিরাষ্ট্র, বাংলাদেশী জাতিরাষ্ট্র। পাকিস্তানি দখলদার সামরিকবাহিনীর বর্বরতার মধ্যে তখন এই জাতি ‘জ্বলে-পুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ সারা বিশ্বে এই জাতির লড়াকু বীরের জাতি হিসেবে কী প্রচণ্ড সুনাম! বীরের জাতি বাঙালি, কখনো অনাচার মেনে মাথা নোয়ায় না, যুদ্ধ করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে নেয়, তবে সে অন্যের অধিকার কেড়ে নিতেও চায় না, কারণ- সে প্রকৃত মানবিক মানুষ, মানুষে মানুষে সে সাম্য চায়- সেসব মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি চায়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়াউর রহমান (পরে লে. কর্নেল পদোন্নতিপ্রাপ্ত) এগারো সেক্টরের এক সেক্টরে সেক্টর-কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করে যান। অচিরেই তিনি ‘জেড’ ফোর্স কমান্ডার অর্থাৎ একটি ব্রিগেডের কমান্ডার হন। তিনি সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের বীরনায়ক হিসেবে অসংখ্য প্রতিরোধ লড়াই পরিচালনা করেন, তাতে বহু পাকসেনা ও অফিসার মারা যায়, বহু দালাল নিহত হয়। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাঙালি সামরিক বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী (সিভিল যোদ্ধা/মুক্তিবাহিনী /ফ্রিডম-ফাইটার) দীর্ঘ ৯ মাস ধরে একের পর এক যুদ্ধ পরিচালনা করা হয় পাকিস্তানি হানাদার দস্যুবাহিনীর বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকার সামরিক যুদ্ধ পরিচালনায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে থাকলে মেজর জিয়াউর রহমান এগিয়ে এসে সশস্ত্র-মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় কর্নেল এম এ জি ওসমানীর (পরবর্তীকালে জেনারেল ওসমানী) পরিচালনায় ‘ওয়ার-কাউন্সিল’ বা এই ধরনের একটি বিশাল বডি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।

মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক (কমান্ডার ইন চিফ) কর্নেল ওসমানী তাতে রাজি না হলে জিয়াউর রহমান নিজেই সেই বডির নেতৃত্ব দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেক্টর কমান্ডার ও সাবসেক্টর কমান্ডারদের একটা বড় অংশ জিয়াউর রহমানকে সেই তৎপরতায় সমর্থন দিয়েছিলেন। তাতে মুক্তিযুদ্ধ আরো বেগবান হতো বলে এসব মুক্তিযোদ্ধা-অফিসারদের বক্তব্য। জিয়াউর রহমানের সেই উদ্যোগে মিত্রবাহিনীর একটা অংশেরও সমর্থন ছিল-কারণ তাতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা দ্রুততর হতে পারত, যেটা রাজনৈতিক নেতাদের মতানৈক্যের কারণে ব্যাহত হচ্ছিল। সেখানে সেক্টর-কমান্ডার এবং পরে ব্রিগেড-কমান্ডার (‘জেড’ ফোর্স কমান্ডার) জিয়াউর রহমান ‘মহাবীরসুলভ’ একটা অবস্থান লাভ করেছিলেন।

পরে পঁচাত্তরপরবর্তী ৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতার অভ্যুত্থানে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে উঠতে থাকেন, তখন তার মধ্যে প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের ‘রোলমডেল’ দেখা গেছে। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে উঠতে থাকলে তিনি রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ কায়েমের পথে অগ্রসর হন। তিনি বাঙালি জাতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপরে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’-এর লেজুড়বৃত্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বাংলাদেশী সংস্কৃতির ভিত গড়ে দেয়ার চেষ্টা চালান। তিনি যে গান শুরু করেন- ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ; জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ’- এই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের গানটি এই জাতির স্বতন্ত্র সংস্কৃতির ভিতভূমি প্রতিষ্ঠা করে দেয়। জিয়াউর রহমান পুরো জাতিকে আলসে-তন্দ্রাগ্রস্ত দশা থেকে জাগিয়ে তোলেন।

স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে খালকাটা কর্মসূচি চালু করেন। সরকারি কর্মকর্তাসহ সব মানুষের দৌড়যাত্রা শুরু করান। প্রবল আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তির সমন্বয় ঘটাতে থাকেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের মুসলিমদের সুসম্পর্ক জাগিয়ে তোলেন, ভূ-রাজনৈতিক কারণে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি গণচীনের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলেন, তাতে করে নয়া-ঔপনিবেশবাদী প্রতিবেশীরা সাবধান হয়ে যায় এবং বাংলাদেশ তার ভেতরে ট্রানজিট প্রদানের নব্য সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার খপ্পর থেকে তখন মুক্তি পায়। মধ্যপ্রাচ্য ও অন্য সব মুসলিম দেশে আমাদের জনশক্তি রফতানির দ্বার খুলে যায়- প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঠিক নেতৃত্বদানের ফলে। জিয়াউর রহমানই একদলীয় বাকশাল থেকে আওয়ামী লীগকে মুক্তি দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। জিয়াউর রহমানের আমলেই এ দেশে রফতানিমুখী পোশাক শিল্পের প্রতিষ্ঠা লাভের সুযোগ ঘটে। ভ্রাতৃঘাতী ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন যা সমগ্র মুসলিমবিশ্বে প্রশংসিত হয়।

ভূ-রাজনৈতিক কারণে প্রতাপশালী প্রতিবেশী দেশটির স্বার্থ রক্ষার তৎপরতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারে তিনি বাধা দিয়েছিলেন প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে- ট্রানজিট না দিয়ে। তিনি ভারতের সব ধরনের নয়া ঔপনিবেশবাদী আগ্রাসনের প্রবল বিরোধিতা করে সাফল্য অর্জন করেছিলেন কারণ মুসলিম বিশে^র ও গণচীনের পর্যাপ্ত সমর্থন লাভে তিনি সফল হয়েছিলেন বলেই। তিনি দেশের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দারুণ উন্নতি ঘটিয়েছিলেন, যা এখন ভাবনারও বাইরে।

জিয়াউর রহমান দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছাত্র ও যুবসমাজকে কর্মোদ্যমী করতে যথেষ্ট উদ্যোগী হয়েছিলেন। তিনি এ দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটা সফল প্রয়াস পেয়েছিলেন যেটা স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে একটি অনন্য ঘটনা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। হিজবুল বাহার নামক সমুদ্রগামী জাহাজে মেধাবী ছাত্র ও যুবনেতাদের নিয়ে তিনি তিন দিনের এক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালনা করেছিলেন। সেটা ছিল তার, এক সফল রাষ্ট্রনায়কের কাজ। অথচ এই দেশের কিছু অর্ধশিক্ষিত ও অর্বাচীন রাজনৈতিক নেতা ও কিছু ভাড়াটে ধাঁচের বুদ্ধিজীবী সেই প্রশিক্ষণ শিবিরের তুমুল সমালোচনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই প্রশিক্ষণকর্মটি পরিচালনা করে সঠিক কাজটিই করেছিলেন যথাসময়ে।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এক অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠেছিলেন ফলে বিভিন্ন নয়া ঔপনিবেশবাদী চক্রান্তে তার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। বাংলাদেশের তথা সারা বিশে^র নেতৃত্বে এক অসাধারণ শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডে। বাঙালি জাতি ও রাষ্ট্র হারায় তার সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ককে। তবে শহীদ জিয়াউর রহমান তার কর্মের মাধ্যমে অমর থাকবেন এ জাতিরাষ্ট্র যত দিন থাকবে, ঠিক তত দিন। বাংলাদেশী জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অতুলনীয়।
লেখক : বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এবং সাবেক সংসদ সদস্য

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘সরকার খালেদা জিয়ার রায় নির্ধারণ করে রেখেছে।’ তার এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি কি একমত?