মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

মঙ্গলবার, ০১ মে, ২০১৮, ১০:৪০:০৯

একাদশ সংসদ নির্বাচন মসৃণ পালাবদলের বার্তা দেয় কি?

একাদশ সংসদ নির্বাচন মসৃণ পালাবদলের বার্তা দেয় কি?

পৃথিবীর যেসব দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অনুসৃত হয় সেসব দেশে সরকারের পালাবদলের একমাত্র মাধ্যম হলো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। পৃথিবীর অপরাপর গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের জয় ও পরাজয় উভয়ের নজির রয়েছে। এ সব দেশে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন ক্ষুদ্র পরিসরের মন্ত্রিসভা সমন্বয়ে গঠিত হয় এবং এ সময় ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের ক্ষুদ্র পরিসরের মন্ত্রিসভা এমন কোনো কাজ করে না; যা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। এ সব দেশের মানুষ গণতন্ত্র এবং জনরায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কারণে বেশির ভাগ আগেই দেখা যায় নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পূর্বেই বিজিত দল পরাজয় শিকার করে বিজয়ী দলের প্রধানকে অভিনন্দন জানায় এবং সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস ব্যক্ত করে।

আমাদের আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচন সংবিধানের বর্তমান ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হলে সে ক্ষেত্রে তা বর্তমান ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বটি সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। একটি নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠান করতে হলে সংবিধান ও আইনের বিধানাবলি অবলোকনে যে ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের আবশ্যকতা রয়েছে আমাদের নির্বাচন কমিশনকে সে ধরনের ক্ষমতা দেয়া আছে।

আমাদের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ এবং দশম এ ছয়টি সংসদ নির্বাচনের কোনোটিতেই ক্ষমতাসীন দল পরাভূত হয়নি। এ ছয়টি নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন যেসব ব্যক্তি সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত ছিল তারা সবাই সে সময়কার দলীয় সরকার প্রধান কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এ ছয়টি নির্বাচনের মধ্যে প্রথমোক্ত দু’টি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও শেষোক্ত চারটি অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন ছিল। এ চারটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলে নির্বাচনের ফলাফল যে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের প্রতিকূলে যেত তা সে সময়কার পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলির আলোকে সমর্থিত।

ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না- এ কথাটি আমাদের বর্তমান প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাকালীন না মানলেও ক্ষমতার বাইরে থাকাকালীন মেনে থাকেন।

আমাদের দেশে সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তন-পরবর্তী দু’টি সংসদ নির্বাচন সে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ দু’টি নির্বাচনের একটিতে আওয়ামী লীগ এবং অপরটিতে বিএনপি বিজয়ী হয়েছিল। এ দু’টি নির্বাচনের প্রথমোক্তটি অনুষ্ঠানের অব্যবহিত আগে বিএনপি এবং শেষোক্তটি অনুষ্ঠানের অব্যবহিত আগে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন ছিল।

অষ্টম সংসদের মেয়াদ অবসানজনিত কারণে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজনে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি গঠিত হয়েছিল তা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনসংক্রান্ত বিধানাবলির অনুসরণে গঠিত না হওয়ার কারণে সেনা হস্তক্ষেপে পদত্যাগে বাধ্য হয়। অতঃপর সেনা সমর্থিত যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় সেটিকে অদ্যাবধি সাংবিধানিক বৈধতা দেয়া হয়নি, যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধতাবিষয়ক মামলাটির আপিল আদেশে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনার অবতারণায় এটিকে বৈধতা দেয়ার প্রয়াস নেয়া হয়। সাংবিধানিক বৈধতার অনুপস্থিতিতে এ ধরনের বৈধতা আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না এর মীমাংসা হওয়া জরুরি।

দশম সংসদ নির্বাচনটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণে একতরফা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের জন্য উন্মুক্ত ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টির প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় এ সংসদ সংবিধানের বিধানাবলির অনুসরণে গঠিত হয়েছে কি না এ প্রশ্নটির উদয় হয়।

দশম সংসদ নির্বাচনটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামী সে নির্বাচনটিতে অংশগ্রহণ হতে বিরত থাকে। এ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন যাদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত ছিল এরা কেউই নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে নিরপেক্ষতার ছাপ রাখতে পারেননি। দশম সংসদ নির্বাচনটি ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের পরিবর্তে যেকোনো ধরনের নির্দলীয় ব্যক্তি সমন্বয়ে গঠিত সরকার সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হলে ফলাফল যে ভিন্নতর হতো তা এ দেশের সচেতন জনমানুষ অনুধাবনে সক্ষম।
দশম সংসদ নির্বাচনটি অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন হওয়ার কারণে ভারত ও ভুটানের চারজন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ব্যতীত কোনো বিদেশী নির্বাচন পর্যবেক্ষক এ নির্বাচনটি পর্যবেক্ষণ করেননি। উপরোক্ত চারজন বিদেশী পর্যবেক্ষকের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত ব্যয়ভার নির্বাচন কমিশন বহন করায় নির্বাচন বিষয়ে তাদের প্রতিবেদন দেশী ও আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন ভারতে কংগ্রেস ক্ষমতাসীন ছিল। এ নির্বাচনটি অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে দেখা গেল ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিশেষ বিমানযোগে ঝটিকা সফরে বাংলাদেশে এসে জাতীয় পার্টি প্রধান এরশাদকে এ মর্মে সতর্ক করেন যে, তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে এ দেশে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে মৌলবাদের উত্থান ঘটবে। বাংলাদেশে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া পরবর্তী ভারতের লোকসভা নির্বাচনে প্রকৃত অর্থেই সে দেশের ধর্মীয় উগ্রবাদী মৌলবাদ সমর্থক বিজেপি জোটের বিজয় ঘটে। বিজেপির এ বিজয় স্বভাবতই যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে তা হলোÑ যারা নিজ দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদী মৌলবাদের উত্থান ঠেকাতে ব্যর্থ তারা কি করে অপর দেশে তথাকথিত মৌলবাদের উত্থানের কাল্পনিক অজুহাত দাঁড় করান?

বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ দলীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয় ২০০১ সালে ভারতের তৎকালীন সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থা র-এর পৃষ্ঠপোষকতায় বিএনপি নির্বাচনে বিজয় হাসিল করেছিল। আওয়ামী লীগ প্রধানের মতো বিএনপি প্রধানের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয় ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভারত সরকার ও র-এর আনুকূল্যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়। বড় দু’টি দলের প্রধানদ্বয়ের এ দাবি দ্বারা এটি প্রতিষ্ঠিত যে ভারত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল তাদের স্বার্থের প্রয়োজনে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে সচেষ্ট।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন হওয়া সত্ত্বেও ভারতের একনিষ্ঠ সমর্থনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, চীন প্রভৃতির তৎসময়ের নীতিগত ও কৌশলগত অবস্থান ক্ষমতাসীনদের অনুকূলে ছিল। ২০১৪ পরবর্তী বিশ্বরাজনীতি ও আমাদের এতদঅঞ্চলের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ২০১৪ সালে ভারতের পক্ষে যেটি সম্ভব ছিল ২০১৮ সাল শেষে অথবা ২০১৯ সালের প্রারম্ভে সেটি যে সম্ভব নয় তা ঘটনাপ্রবাহের আলোকে অনেকটা প্রতিভাত।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, চীন প্রভৃতি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে বার্তা দেয়া হচ্ছে তাতে প্রতীয়মান হয় আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয় সে বিষয়ে এ দেশগুলো খুবই তৎপর। এ দেশগুলোর এহেন তৎপরতার বিপরীতে ভারতের পক্ষে এককভাবে ২০১৪ সালের মতো তাদের অনুগামী দলকে পুনঃক্ষমতাসীন করা যে দুরূহ তা অতি সহজেই অনুমেয়।

আমাদের দেশের অতীতের যেকোনো ক্ষমতাসীন দলের মতো বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কাছে আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচন বিষয়ে যা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় নির্বাচনের আয়োজন করে বিজয় নিশ্চিত করা। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষমতাসীনদের অধীন আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে তাতে তাদের বিজয় যে অনিশ্চিত এ সত্যটুকু উপলব্ধি করে তারা যে এ পথে পা বাড়াতে অপরাগ তা অনেকটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে দেখা গেছে তৃতীয়পক্ষ জড়িত হওয়ার কারণে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের পথ প্রশস্ত হয়েছে, যা প্রকারান্তরে পরে মসৃণভাবে ক্ষমতার পালাবদলের অন্তরায়ের অবসানের যোগসূত্ররূপে কাজ করেছে।

ইকতেদার আহমেদ

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি জাতিসংঘে যাওয়ায় সরকার আতঙ্কিত - ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের এ বক্তব্য সমর্থন করেন কি?