শনিবার, ২০ জানুয়ারী ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

বুধবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১১:৫২:০০

আমাদের গন্তব্য কোথায়?

আমাদের গন্তব্য কোথায়?

রাজধানীতে ছিনতাইকারীরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। রীতিমত ভয়ংকর হয়ে উঠছে ছিনতাইকারী চক্র। তারা শুধু টাকা, গয়না, মোবাইল কিংবা অন্য মূল্যবান জিনিসপত্রই নিচ্ছে না, মানুষের জানও কেড়ে নিচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিকার। কোথাও কোথাও পুলিশ প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ বাহিনীর কিছু কিছু সদস্যও সরাসরি ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। এটি উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও ভীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে জনগনের মধ্যে। অবশ্যই এরই মধ্যে ছিনতাইয়ে জড়িত বেশ কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
 
হতাশার বিষয় হচ্ছে প্রতিদিন ছিনতাই হচ্ছে, মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছে, মারা যাচ্ছে -কিন্তু কোন প্রতিকার নেই। এসব দেখারও যেন কেউ নেই। তাহলে এ পুলিশ, প্রশাসন, সরকারের কাজ কি?
 
বলাবলি হচ্ছে, শুধু ছিনতাই কেন- সন্ত্রাস, খুন, বিনাবিচারে মানুষ হত্যা, গুম, ধর্ষণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস, চাল, ডাল, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, লুটপাট, দুর্নীতি কিছুই থামাতে পারছে না সরকার।
 
আজকের জাতীয় দৈনিকগুলোতে ছিনতাইকারীদের হাতে চার বছরের শিশু খুনের খবর আমাকে অত্যন্ত বেদনাহত করেছে। খবরে প্রকাশ চার বছরের বড় ছেলে আলামিন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা জোগাড় করে তাকে নিয়ে শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন শাহ আলম-আকলিমা দম্পতি। সঙ্গে ছিল কোলের শিশু, ছয় মাস বয়সী ছোট ছেলে আরাফাতও। ঢাকার সদরঘাটে লঞ্চ থেকে নেমে রিকশায় শনির আখড়া যাওয়ার পথে দুই হাতে কোলের শিশুকে আগলে রেখেছিলেন মা আকলিমা। কিন্তু তাঁর কাঁধের ভ্যানিটি ব্যাগে আচমকাই ছিনতাইকারীর জোরে টান দিলে হাত থেকে ফসকে রাস্তায় পড়ে যায় ছোট্ট শিশু আরাফাত। নিজেও ছিটকে পড়েন রাস্তায়। মুহূর্তেই নাক-মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে রক্ত। ছটফট করতে থাকে আরাফাত।
 
যে হাতে আরাফাতকে আগলে রেখেছিলেন মা, দ্রুতই সেই হাতে তুলে নেন রক্তাক্ত ছেলেকে। কিন্তু এতটুকু শিশু কি আর এত বড় ধকল সইতে পারে? একবার শুধু মা -মাগো বলে ডাক দিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। প্রথমবার রাজধানীতে এসেই প্রাণ গেল শিশু আরাফাতের। আহত হন তার মা আকলিমাও।
 
গত সোমবার ভোর ৬টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানাধীন দয়াগঞ্জ এলাকার পাড় গেণ্ডারিয়ার ১৯/১ নম্বর ভবনের সামনে ঘটে এ মর্মান্তিক ঘটনা। এর আগে গত অক্টোবরে ছিনতাইকারীর কবল থেকে এক নারীকে বাঁচাতে গিয়ে দয়াগঞ্জের কাছেই টিকাটুলীতে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান আবু তালহা নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র।
 
দুর্ঘটনার পর সোমবার যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গের সামনে শিশু আরাফাতের লাশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মা আকলিমা তখন দেখা গেছে, বারবার মর্গের দরজার দিকে গিয়ে প্রিয় সন্তানের মুখটি দেখার চেষ্টা করছেন তিনি। এর মধ্যেই সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি লাশ বের করা হয় মর্গ থেকে। আকলিমা ছুটে যেতে থাকেন সেই লাশের দিকে। তখন লোকজন বাধা দিয়ে জানায়, এটা তাঁর সন্তানের লাশ নয়, বড় মানুষের লাশ।
 
তখন কাতর কণ্ঠে অসহায় আকলিমার প্রশ্ন, ‘আমার পোলাডারে দিব না?’ যেন অসুস্থ বড় ছেলের চিকিৎসা দূরে থাক, আকলিমার জন্য ‘সুস্থ’ ছোট ছেলের লাশ পাওয়াও দুরূহ এই শহরে!
 
আরাফাতের বাবা শাহ আলম পুলিশকে জানিয়েছেন, রিকশা দিয়ে যাওয়ার সময় এক ছিনতাইকারী দৌড়ে এসে টান দিয়ে তাঁর স্ত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে যায়। মুহূর্তেই রিকশা থেকে ছোট ছেলে আরাফাত ও তাঁর স্ত্রী রাস্তায় পড়ে যান। মাথা ও নাক ফেটে রক্তাক্ত হয়ে মারা যায় আরাফাত।
 
৮ ডিসেম্বর গ্রামের বাড়ি বগুড়া থেকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলার বাসায় ফিরছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী ইকবাল মাহমুদ। ভোরে কল্যাণপুরে বাস থেকে নেমে রিকশায় যাওয়ার পথে শ্যামলীতে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা ছোঁ মেরে তাঁর হাতব্যাগটি নিয়ে পালিয়ে যায়।
 
ওই ব্যাগে চার হাজার টাকা ও কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল জানিয়ে ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘মামলা করতে পুলিশের কাছে গেলে নানা কথা শুনতে হবে— এ কারণে আর অভিযোগ করিনি। পেপারে দেখলাম একজন ডাক্তার মারা গেছেন। অপরাধীরা তো ধরা পড়ে না। ’
 
রাজধানীতে কোনো না কোনো এলাকায় এমন ঘটনা ঘটছে প্রতিদিনই। পুলিশ প্রশাসনের উদাসীনতায় রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ‘টানা পার্টি’র দৌরাত্ম্য; যারা ছোঁ মেরে ব্যাগ, ল্যাপটপসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়।
 
রাজধানীতে গত দুই মাসের অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ছিনতাইকারীদের গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়েছে তিনজন, আহত অর্ধশতাধিক।
 
মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডে টানা পার্টির কবলে পড়ে গত ৫ ডিসেম্বর মারা যান জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক ফরহাদ আলম। গত ২৯ নভেম্বর বিকেলে কর্মস্থল থেকে রিকশায় মোহাম্মাদিয়া হাউজিং সোসাইটির বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীরা টান দিয়ে তাঁর ব্যাগ নিয়ে যায়। এতে তিনি ছিটকে রাস্তায় পড়ে আহত হয়েছিলেন।
 
এ ছাড়া গত ৮ অক্টোবর টিকাটুলীতে এক নারীকে ছিনতাইকারীদের কবল থেকে বাঁচাতে গিয়ে খুন হন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আবু তালহা খন্দকার। সর্বশেষ গত সোমবার ভোরে দয়াগঞ্জ রেললাইনের কাছে ছিনতাইকারী গৃহবধূ আকলিমা বেগমের ভ্যানিটি ব্যাগ টান দিলে তাঁর কোল থেকে পড়ে মারা যায় ছয় মাসের শিশু আরাফাত।
 
পত্রকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী গত দুই মাসে টানা পার্টির হাতে তিন ডজন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ভোরে, বিকেলে এবং সন্ধ্যার পর ঘটেছে এসব ঘটনা। অথচ পুলিশের নথিপত্রে মাত্র ১২টি ছিনতাইয়ের ঘটনার কথা উল্লেখ আছে।
 
ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে জানা গেছে, প্রতিকার না পাওয়ায় ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে যাচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চৌকি (চেকপোস্ট) বসালেও গাড়ির কাগজপত্র দেখায়ই বেশি ব্যস্ত থাকেন পুলিশ সদস্যরা। তা ছাড়া ভোরে ও বিকেলে টহল ও তল্লাশি থাকে না বেশির ভাগ এলাকায়। এ সুযোগে বেড়ে গেছে ছিনতাইকারীচক্র।
 
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাজধানীর ১৪১টি স্পট আছে যেখানে বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এলাকাভিত্তিক বখাটেরা ছিনতাইয়ের ‘গ্যাং পার্টি’ গড়ে তুলেছে। এরই মধ্যে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ছিনতাইকারীদের বেশ কিছু চক্রের তথ্য সংগ্রহ করেছে। এলাকাও শনাক্ত করা হচ্ছে।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েকটি এলাকায় ছিনতাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরের কলেজগেট থেকে রিং রোড, আগারগাঁওয়ের সংযোগ সড়ক, খিলক্ষেত থেকে বিমানবন্দর সড়ক, মৌচাক মার্কেট থেকে মগবাজার, সদরঘাট থেকে সূত্রাপুর-দয়াগঞ্জ, ওয়ারী, উত্তরা থেকে আব্দুল্লাহপুর, ঝিগাতলা থেকে রায়েরবাজার-শংকর, মিরপুরের রূপনগর-বেড়িবাঁধ, যাত্রাবাড়ীর দোলাইরপাড়-শ্যামপুর উল্লেখযোগ্য।
 
রাজধানীতে ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি গত ৯ ডিসেম্বর ডিএমপির মাসিক অপরাধ সভার আলোচনায়ও উঠে আসে। সেখানে ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘ছিনতাই প্রতিরোধে টহল বাড়ানোর পাশাপাশি চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাতে হবে।’ কিন্তু এখনো এর কিছুই হয়নি।
 
চিকিৎসক ফরহাদ আলমের মৃত্যুর ঘটনায় গত দুই সপ্তাহেও ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। গত ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের মেলা থেকে একটি ল্যাপটপ কিনে রিকশায় কল্যাণপুরের বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন কালের কণ্ঠ’র বার্তা বিভাগের শিফট ইনচার্জ ও কবি সফেদ ফরাজী। মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা সফেদের ল্যাপটপের ব্যাগটি টান দিয়ে নিয়ে যায়। ওই সময় রিকাশা থেকে পড়ে আহতও হন তিনি। এখনও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
 
সম্প্রতি কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তরুণ মডেল আরমান হোসেন। শুটিং শেষ করে উত্তরা থেকে মোটরসাইকেলে রামপুরার বাসায় ফেরার পথে তিন ছিনতাইকারী পিস্তল ঠেকিয়ে আইফোন ও পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে চলে যায়।
 
খিলক্ষেত থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কে রাতে ও ভোরে প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি ওই এলাকায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ৪০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ১০ ডিসেম্বর রাতে ওয়ারীতে শাহীদা নামের এক নারীর পায়ে গুলি করে টাকাসহ হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা।
 
চলতি বছর দুইবার ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলেন নিউ মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ। তিনি সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ‘প্রতি রাতে উত্তরায় বাসায় ফেরার সময় একটা-দুটো চেকপোস্ট দেখি। সেখানে পুলিশ অপরাধী বের করার তল্লাশি করে না। করে ট্রাফিক পুলিশের কাজ। ঝামেলা দেখলে চলে দেনদরবার। তখন অপরাধীরা পাশ দিয়ে চলে যেতে পারে।’ তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘ভোরে চেকপোস্ট বলে কিছু থাকে না। ’
 
এর আগে ২০১৪ সালের ২৮ অক্টোবর ধানমণ্ডির সোবহানবাগে টানা পার্টির কবলে পড়ে শিশুসন্তান রাইসার সামনে প্রাণ হারান মা রিপা। ২০১৫ সালের ২৪ আগস্ট কমলাপুরে চিকিৎসক দম্পতি সানজানা জেরিন খান ও মোনতাহিন আহসান ভূঁইয়া রনি একইভাবে পড়েন টানা পার্টির কবলে। মাথায় গুরুতর জখমে কোমায় চলে গেছেন ডা. জেরিন।
 
দৈনিক কালের কন্ঠের অনুসন্ধানে জানা যায়, ছিনতাইকারী বা টানা পার্টি চক্রে স্থানীয় ছাত্রলীগকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসহ বখাটে গ্রুপ জড়িত। গত ৮ নভেম্বর এমন একটি ছিনতাইকারী গ্রুপ রায়েরবাজারের তরুণ সাব্বির হোসেনকে হত্যা করে।
 
গত বছরের ডিসেম্বরে মিরপুর থেকে ছিনতাইকারী চক্রের হোতা গোপালগঞ্জ ছাত্রলীগ নেতা তুহিনকে গ্রেপ্তার করে পল্লবী থানা পুলিশ। পরে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানায়, মিরপুর কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে মিরপুর, পল্লবী, কালশী ও কাফরুল এলাকায় মোটরসাইকেল দিয়ে রিকশাআরোহীদের ব্যাগসহ দামি জিনিস ছিনিয়ে নিত চক্রটি।
 
গত ২ নভেম্বর বেলা আড়াইটার দিকে মিরপুর-২ নম্বরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সামনে আশিস দুগ্গাল নামের ভারতীয় এক নাগরিক ছিনতাইয়ের শিকার হন। আশিস দুগ্গাল ও তার বাংলাদেশের সহকর্মী আরিফুল ইসলাম মিরপুর-২ নম্বরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন থেকে মিরপুর-১ নম্বরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে যাচ্ছিলেন। এ সময় একটি বাইকে চড়ে দুই ছিনতাইকারী আশিসের ব্যাগ নিয়ে টেকনিক্যালের দিকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (নম্বর-২৭) করেছেন আশিস। ব্যাগে একটি ল্যাপটপ, ল্যাপটপ চার্জার, মোবাইল চার্জার, একটি হার্ড ডিস্ক, মূল্যবান তথ্যসংবলিত চারটি পেনড্রাইভ ছিল।
 
গত ৮ অক্টোবর সকালে রাজধানীর টিকাটুলীর কে এম দাস লেনের ১২/২ নম্বর বাসা থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে হুমায়ুন সাহেবের বাড়ির সামনে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আবু তালহা খন্দকার। ছিনতাইকারীরা তার মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। একই স্থানে সাদিয়া নামের এক স্কুল শিক্ষিকা এবং তার ভাই সানির মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করে ছিনতাইকারীরা। এ সময় তালহা সাহস করে এক ছিনতাইকারীকে জাপটে ধরে চিৎকার দেয়। কিন্তু আশপাশের কেউ এগিয়ে না আসায় ছিনতাইকারীরা তালহাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর তালহার মৃত্যু হয়।
 
বাংলাদেশ প্রতিদিনের একপ্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কে এম দাস লেনসহ টিকাটুলীর আর কে মিশন রোড, অভয় দাস লেন, গোপীবাগ রেল গেট, হুমায়ুন সাহেবের রেল গেটসহ পুরো এলাকাজুড়ে বহুদিন ধরেই ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য। প্রায় প্রতিদিনই এসব এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এই ছিনতাইকারী গ্রুপের ১০/১২ জন সদস্য তিন বছরে শতাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের হাতে আহত হয়েছে কমপক্ষে ২০ জন। এ ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগে একই ছিনতাইকারী গ্রুপ ফ্লাইওভারে ওঠার মুখে পরপর দুই দিন দুটি ছিনতাই করে।
 
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যমতে, গত দুই মাসে রাজধানীতে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে আহত হয়ে এখানে চিকিৎসা নিয়েছে কমপক্ষে ৪৯ জন। এর মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার একজন মাঠ কর্মকর্তাও ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত দুই মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনায় যে সব থানা এলাকার মানুষ চিকিৎসা নিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে, কাফরুল, শাহআলী, দারুস সালাম, কলাবাগান, শেরেবাংলা নগর, ভাসানটেক, যাত্রাবাড়ী, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর থানা।
 
পুলিশের ভাষ্য মতে, ছিনতাই প্রতিরোধে ঢাকার অনেক সড়ক ও বাড়িতে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বা সিসিটিভি বসানো হয়েছে। পুলিশ ও র‌্যাবের প্যাট্রল ডিউটি, ফুট প্যাট্রল ও সাদা পোশাকে ডিউটির পাশাপাশি ছদ্মবেশে গোয়েন্দা নজরদারিও করা হচ্ছে। তবুও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েই চলছে। পত্রিকাটির অনুসন্ধানী ওই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গোলাপবাগ থেকে টিকাটুলী এবং গোপীবাগ এলাকায় আসলাম গ্রুপ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ও ভয়ঙ্কর।
 
এ ছাড়া মকবুল গ্রুপের কামাল, করিম, কালাম, পলাশসহ আরও কয়েকজন টিকাটুলী থেকে মধুমিতা সিনেমা হলের পেছনের এলাকা হয়ে মতিঝিল এলাকায় ছিনতাই করে। তবে গোটা রাজধানীতে অন্তত দেড় শতাধিক ছিনতাইকারী চক্র রয়েছে। এদের অনেকেই সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। মাদকের টাকা জোগাড় করতেই এরা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
 
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পর্যন্ত এলাকায় সক্রিয় সোর্স হানিফের ছিনতাইকারী গ্রুপ। এই গ্রুপে আছে ডিব্বা রাব্বি, মোহাম্মদ আলী, রিয়াজ, সুম, মিঠুসহ আরও কয়েকজন। আর যাত্রাবাড়ীর অলিগলিতে ছিনতাই করে সোর্স রাজুর নেতৃত্বে দিদার, খাকি বাবু, জাহাঙ্গীর, মিলনসহ বেশ কয়েকজন। টিকাটুলী থেকে রাজধানী মার্কেট হয়ে দয়াগঞ্জ পর্যন্ত সক্রিয় আরও দুটি গ্রুপ। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
 
সম্প্রতি ধানমণ্ডি ২৮ নম্বর সড়কে সন্ধ্যার ছিনতাইয়ের শিকার হন পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের চিকিৎসক ডা. অনুপ সরকার অপু। রিকশায় করে মোহাম্মদপুর মেটার্নিটি হাসপাতালে যাওয়ার সময় দুটি মোটরসাইকেলে করে চার যুবক ফিল্মি স্টাইলে রিকশা থামিয়ে তার সঙ্গে থাকা ব্যাগটি নিয়ে চলে যায়। ওই ব্যাগে তার দামি স্মার্ট মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও তার মায়ের চিকিৎসার কাগজপত্র ছিল। এ ব্যাপারে অপু বলেন, আমি জানতে পেরেছি ওরা নাকি ধনাঢ্য পরিবারের স্থানীয় বখে যাওয়া যুবক। পুলিশি হয়রানির কথা চিন্তা করে ইচ্ছে করেই থানায় কোনো অভিযোগ দেইনি।

লেখক: জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
 

আজকের প্রশ্ন

শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহনীয় মাত্রায় ঘুষ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। জাতির জন্য এমন পরামর্শ ভয়ানক নয় কি?