শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

মঙ্গলবার, ০২ জানুয়ারী, ২০১৮, ১২:৩৩:৫৯

কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের বছর ২০১৭ সাল

কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের বছর ২০১৭ সাল

ঢাকা: সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষার ভিত্তিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হলেও ২০১৭ সালে এসে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। কারণ, এতদিন প্রতিবেশী দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসা বাংলাদেশ যখন দেখল রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো প্রতিবেশীরই সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে না। এক প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা সংকটে অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো বাংলাদেশের পাশে না থাকার বিষয়টিও কূটনীতির কঠিন বাস্তবতায় ফেলে দিয়েছে। বলতে গেলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা নিয়ে এত বড় সংকটে বাংলাদেশ আগে কখনো পড়েনি।

বাংলাদেশের কূটনীতিতে ২০১৭ সালের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর জানান, নিঃসন্দেহে বছরটি ছিল বাংলাদেশের কূটনীতিতে চ্যালেঞ্জের বছর। কারণ, গতানুগতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রোহিঙ্গা নিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২০১৮ সালেও বাংলাদেশের কূটনীতিকে অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় মাইলফলক ছিল। কিন্তু তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে বাংলাদেশ কিছুই পাইনি। বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ২০১১ সালে ভারতে রফতানি শুরু হলেও গতি আসেনি। বরং বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাট রফতানিতে নতুন করে শুল্ক আরোপ করায় গতি কমেছে। এ ছাড়া নিরাপত্তা, ভিসা সহজীকরণ ও কানেকটিভিতে দ্বিপাক্ষিক অনেক কাজ হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চীন ও পাশ্চাত্য দেশগুলোর অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাবেক এই কূটনীতিক আরো জানান, এক্ষেত্রে আমরা চীনের সমর্থন না পেলেও আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছি। তবে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীন যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ আশা করে, রোহিঙ্গা সংকটে সরাসরি বাংলাদেশের পাশে না থাকলেও সংকট নিরসনের মাধ্যমে ভূমিকা রাখবে চীন। অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকটে প্রতিবেশী দেশগুলোর সরাসরি সমর্থন বাংলাদেশ না পেলেও পাশ্চাত্য দেশগুলোর একচ্ছত্র সমর্থন বাংলাদেশ পেয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুনামও আন্তর্জাতিক মহলে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকট নিরসন ও বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশকে লাভবান হতে হলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দক্ষতা দেখাতে হবে। তবে সামনে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি একটি সুযোগ রয়েছে। কারণ, রোহিঙ্গা সংকট সঠিকভাবে সমাধান করতে পারলে বাংলাদেশের কূটনীতির গুরুত্ব আরো বাড়বে।

২০১৭ সালের কূটনৈতিক তৎপরতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, গত এক বছরের কূটনৈতিক তৎপরতা এক কথায় মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে ২০১৭ সাল ছিল কূটনৈতিক সাফল্যের একটি মাইলফলক। সাংস্কৃতিক কূটনীতিতেও আমরা সফল হয়েছি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে। আমরা আগামী ১০০ বছরের জন্য একটি ডেল্টা প্ল্যান (বদ্বীপ পরিকল্পনা) করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ বছর বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। এটিও আমাদের বড় একটি সাফল্য। এ ছাড়া জেরুজালেম বিষয়ে আমরা বিভিন্ন ফোরামে নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করেছি। এ ছাড়া রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশের কূটনীতি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে এ দেশের বৈশ্বিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। সিলেট অঞ্চলের শীতলপাটি বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৬ সালে ঢাকায় সন্ত্রাসী হামলার পর পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তাও অনেকটা সহনশীল মাত্রায় এসেছে এ বছর। বিদেশিদের সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ ছিল বছরজুড়েই।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনগুলোতে যে কোনো ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত আছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অগ্রগতি বিষয়ে তিনি বলেন, তিস্তা চুক্তি না হলেও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে। রেলসেবা বেড়েছে। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আসছে। আগামী দিনে আরো বিদ্যুৎ আসবে। এ ছাড়া উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বেড়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির বলেন, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালে ভালো কাজ করেছে। বিশ্বজুড়ে আমাদের একটি অবস্থান আছে। শান্তি রক্ষা ছাড়াও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখছি আমরা। ক’দিন আগে ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে প্যারিসে একটি সম্মেলন হলো, সেখানেও আমাদের দেশ একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুটি। যার জন্য পৃথিবীতে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। রোহিঙ্গাদের ওপর ধর্ষণ হয়েছে, তাদের ওপর অত্যাচার, হত্যা, নিপীড়ন করা হয়েছে। যার ফলে তারা আমাদের দেশে পালিয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বলতে পারতেন, আমাদের দেশে তাদের ঢুকতে দেব না। কিন্তু তিনি এটি করেননি। তিনি বলেছেন, এই দেশের ১৬ কোটি মানুষ খেলে রোহিঙ্গারাও খাবে। তাদের জায়গা দেয়ার পর জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস, আইওএমসহ আরো অনেক সংস্থা মিলে তাদের জন্য কাজ করছে। এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ একটি আলাদা স্থানে চলে গেছে। আগে যারা বাংলাদেশকে চিনত না তারা এখন বাংলাদেশেকে চিনেছে এবং সুনাম করছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির বলেন, আরো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ক্ষেত্রে ভারত, চীন, আরব দেশগুলোর সঙ্গে ভালো কাজ করেছে বাংলাদেশ। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনেকে চীনকে দোষারোপ করে থাকেন। আমাদের একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, চীন ও মিয়ানমারের সম্পর্ক গত ৪০-৫০ বছর ধরে। এখন আমাদের জন্য বা রোহিঙ্গাদের জন্য তারা তো আর এই সম্পর্ক নষ্ট করবে না। তবে তারা বুঝে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে, তাদের পুনর্বাসনের দরকার। তাই আমাদের বলেছে যেন জাতিসংঘের মাধ্যমে এটির ব্যবস্থা করা হয়। ভারত শুরু থেকে মিয়ানমারে পক্ষে ছিল। তবে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য আড়াই কোটি ডলার দিয়েছে। এসব কিছু আমাদের কূটনৈতিক সফলতা।

তিনি বলেন, আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে আমাদের আলাদা একটি মাত্রা তৈরি হয়েছে। এ বছর আমাদের দেশে থেকে প্রায় দশ লাখ শ্রমিক বিদেশে গেছে। যে যে দেশে শ্রমিক নেয়া বন্ধ ছিল, সেই দেশের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে আলোচনা করে শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে ২০১৭ সাল ছিল আমাদের পররাষ্ট্র, কূটনৈতিক সফলতার বছর।

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি জাতিসংঘে যাওয়ায় সরকার আতঙ্কিত - ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের এ বক্তব্য সমর্থন করেন কি?