শনিবার, ২০ জানুয়ারী ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ০৫ জানুয়ারী, ২০১৮, ০২:১৬:১৬

বিতর্কিত ৫ জানুয়ারির চার বছর আজ

বিতর্কিত ৫ জানুয়ারির চার বছর আজ

ঢাকা: আজ শুক্রবার ৫ জানুয়ারি, ২০১৮ সাল। চার বছর পূর্ণ হলো আসন ভাগাভাগির সেই বিতর্কিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। বলাবাহুল্য, আজ থেকে চার বছর আগে অর্থাৎ গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি রোববার ‘বিতর্কিত’ এক নির্বাচন সারা বিশ্বের চোখ আটকে গিয়েছিল বাংলাদেশের দিকে। ওই নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশে সংঘটিত হয় নজিরবিহীন সহিংসতা।

নির্বাচন বাতিলের দাবিতে নির্বাচনের আগের দিনই জেলায় জেলায় ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ করা হয়। নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় সহিংসতা। নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট হরতালসহ নানাবিধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল আগেই। ওই কর্মসূচি আর ভোট ঠেকানোর আন্দোলনে ভোটের দিন ও আগের দুই দিনে অন্তত ২৫ জন মারা যান। হামলায় মারা যান নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত এক কর্মকর্তাও। ভোটের আগের দিন রাতেই ৪৩ জেলার দু’শতাধিক ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ঠাকুরগাঁওয়ে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার জোবায়দুল হককে পিটিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এছাড়া মৌলভীবাজার, যশোরের মনিরামপুরে আরো দুই সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারকে কুপিয়ে আহত করা হয়। তাছাড়া কয়েকটি কেন্দ্র থেকে হাতবোমা উদ্ধার করে পুলিশ। অব্যাহত অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরণের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায়। রংপুরের পীরগাছা ও লালমনিরহাটে দুই প্রিজাইডিং অফিসার ও চট্টগ্রাম, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লক্ষীপুরে দুটি করে এবং দিনাজপুর ও নীলফামারীতে একটি করে কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক দলের প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এটিও ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। ভোটের দিন সকাল থেকেই শুরু হয় সহিংসতা। ১৪৭টি আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রগুলো সকাল থেকেই ছিল ফাঁকা। কয়েকটি আসনের ৪১টি কেন্দ্রে কোনো ভোটই পড়েনি সারা দিনেও। ওইদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন আনসার সদস্য, একজন আওয়ামী লীগ কর্মী ও একজন পথচারী ছিলেন। বাকিরা বিএনপি ও জামায়াত কর্মী। সংঘাত ও সহিংসতার কারণে ওই পাতানো নির্বাচনেও সারা দেশে পাঁচ শতাধিক ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে রংপুরে ৮৪, গাইবান্ধায় ১২৯, নীলফামারীতে ৯টি, দিনাজপুরে ৪৫ এবং বগুড়ায় প্রায় ১০০টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। এদিকে ভোটের দিন ভোট কেন্দ্রগুলো ভোটারশূন্য থাকলেও নির্বাচন কমিশনের ভোটের ফলাফলে গড়ে ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে বলে দেখানো হয়। আর আসনভিত্তিক ফল ঘোষণা হলেও নির্বাচন কমিশন ভোটের হার ঘোষণা করে কয়েক দিন পর।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয় ১৮২ জন। আহত হন পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ। ওদিকে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এক বিবৃতিতে জানায়, ২৫ নভেম্বর থেকে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সহিংসতায় ১৪৯ জন নিহত এবং ৪৮৮৬ জন আহত হন। এসময় ৫৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বলেও তথ্য প্রকাশ হয়।

২০১৪ সালে বছরজুড়েই দেশ-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে ছিল ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যে নির্বাচনকে একতরফা বলছেন অনেকেই। নানা মহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এখনো এটি এক প্রশ্নই রয়ে গেছে অনেকের কাছে। নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত অংশগ্রহণ না করলেও তাদের অনুপস্থিতিতে জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর-অবরোধের মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয় ওই নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তথাকথিত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে; ফাঁকা মাঠে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন ১৫৩ সাংসদ। নির্বাচন নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ হতাশা ব্যক্ত করে। নিরাশ হয় কমনওয়েলথ। তবে একমাত্র ভারত মন্তব্য করে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ওই নির্বাচন আবশ্যক ছিল। নির্বাচনের পরদিন ৬ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র মন্তব্য করে নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি।   

৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিরোধী দল না থাকায় ৮টি স্থগিত আসন বাদে ২৯২টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৩২টিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে জাতীয় পার্টি ৩৩টি, ওয়ার্কার্স পাটি ৬, জাসদ ৫, জাতীয় পার্টি (জেপি), তরিকত ফেডারেশন ও বিএনএফ একটি করে আসন পায়। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পায় ১৩টি আসন।

বিএনপি দাবি করে, ওই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, ওই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। শত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও জনগণ কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছে। যদিও গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ভোটের দিন বিভিন্ন স্থানে ব্যালট পেপার ছিনতাই, ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের প্রকাশ্যে সিল মারার খবর গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি প্রিসাইডিং অফিসাররাও এমন কাজ করেছেন। অধিকাংশ কেন্দ্র ভোটারশূন্য থাকায় সকালের দিকে দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসারদের ঘুমানোর দৃশ্য দেখা গেলেও দুপুরের পর ব্যালট বাক্স ভরে যাওয়ার মতো অবিশ্বাস্য ঘটনার জন্ম দেয় ৫ জানুয়ারি নির্বাচন।

ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পড়তে হয় নানাবিধ প্রশ্নের মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বেশ ক’টি প্রভাবশালী দেশ নির্বাচন নিয়ে বাহাস করে। ভোটের দিন কাতারভিত্তিক টিভি চ্যানেল আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ১শ কেন্দ্রে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি কেন্দ্রে যে একজন ভোটারও আসেননি, সেসব দৃশ্যও সম্প্রচার করে। নির্বাচন নিয়ে সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, বিবিসিসহ প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোয় বারবার বাংলাদেশের নাম উঠে আসে।

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলে আসছেন, দশম সংসদের এ সরকারকে কেউ স্বীকৃতি দেয়নি। তারা (সরকার) দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে শতকরা ৫ ভাগ মানুষের ভোট পায়নি।

আজকের প্রশ্ন

শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহনীয় মাত্রায় ঘুষ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। জাতির জন্য এমন পরামর্শ ভয়ানক নয় কি?