বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ১৮ মে, ২০১৮, ০৬:০৩:৫৯

মালয়েশিয়ার রাজনীতি যেন শেক্সপিয়ারের নাটক

মালয়েশিয়ার রাজনীতি যেন শেক্সপিয়ারের নাটক

মালয়েশিয়ায় ৯মে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। এর পরপরই সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কারামুক্তির ঘটনাকে ''দেশটির নতুন সূচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ'' হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কেননা, এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে লড়াইটা ছিল প্রকাশ্য। তাদের প্রথমজন একসময় দ্বিতীয়জনকে কারাগারে পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন।

মালয়েশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন রোমের জন ক্যাবট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ব্রিজেট ওয়েলশ।

তাঁর মতে, মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে সম্পর্কের গল্পটি এতোটাই নাটকীয় যে, একে শেক্সপিয়ারের নাটকের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে কাহিনীর মধ্যে আনুগত্য, বেইমানি, ট্রাজেডি ও বিদ্রূপ একের অপরের সঙ্গে মিশে আছে।

ড. মাহাথিরের বয়স এখন ৯২। ১৯৯৯ সালে দেশটির অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি আনোয়ার ইব্রাহিমকে দুর্নীতি ও সমকামিতার অভিযোগে জেলে পাঠিয়েছিলেন। জেলে বসে আনোয়ার শেক্সপিয়ারের প্রতিটি গ্রন্থ পড়ে শেষ করেন। কিন্তু তিনি ভাবতেও পারেননি এই নাটকের আবির্ভাব হবে তার নিজেরই রাজনৈতিক জীবনে।

মাহাথির জয়লাভের পর তিনি আনোয়ারের মুক্তি ও ক্ষমা নিশ্চিত করলে দু'জনের সম্পর্ক একই বৃত্তে আসে। শত্রু হয়ে পড়েন বন্ধু, ঠিক শেক্সপিয়ারের নাটকের মতই, যেখানে গল্পের এক পর্যায়ে খলনায়কই হয়ে ওঠেন নায়ক।

স্রোতে গা ভাসানো

এই দু'জনের সম্পর্ক উন্নয়নের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং একে অপরের ঢাল হওয়া। প্রধানমন্ত্রী মাহাথির ১৯৮২ সালে সর্বপ্রথম আনোয়ারকে তার প্রশাসনে জায়গা দেন।

আনোয়ার ইব্রাহিম একজন দৃঢ়চেতা, উদ্যমী ছাত্রনেতা ছিলেন, যিনি সত্তরের দশকে তৎকালীন প্রভাবশালী দল ইউনাইটেড মালায়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন-ইউএনএমও এর বিরুদ্ধে একটি দল গঠন করতে পেরেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন দেশটির স্থানীয় প্রবক্তা, যিনি ওই শক্তিশালী দলটির বিরোধিতা করতে পেরেছেন।

রাজনীতিতে ইসলামের ব্যবহারের সময়কালে আনোয়ারও একই স্রোতে গা ভাসিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে ইরানে বিপ্লবের পর বহু দেশে মুসলিম ক্ষমতায়নের যে জোয়ার উঠেছিলো, সে সময় মালয়েশিয়ার ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির শূন্যস্থান দখল করে নেন আনোয়ার।

মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে যে কয়েকটি পালাবদল হয়েছে তার একটি ছিল আনোয়ারকে ইউএনএমও জোটে অন্তর্ভুক্ত করা। এরপর আনোয়ার খুব দ্রুত উপরে উঠতে থাকেন।

তার ব্যক্তিত্ব ও দক্ষতার কারণে তার সমর্থকরা এমনভাবে কাজ করেছে যেন বিরোধীরা একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে চলে আসে।

আশির দশক এবং নব্বইয়ের শুরুটা ছিল মালয়েশিয়ায় জন্য সুবর্ণ সময়, যখন দেশটিতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন ঘটে।

বিশ্বে যখন এশিয়ার প্রভাব বাড়ছিলো ঠিক তখনই ড. মাহাথির তার নেতৃত্বে মালয়েশিয়াকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে আসেন।

এদিকে, ১৯৯৩ সালে ইউএনএমও-র অধীনে বড় জয়লাভের মধ্যে দিয়ে ড. মাহাথিরের একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে আবির্ভূত হন আনোয়ার ইব্রাহিম। সে সময় "এশিয়ার রেনেসাঁ" নামে একটি বই লেখেন। এভাবে তিনি মালয়েশিয়ার প্রেরণা ও আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দিয়ে নিজেকে এশিয়ার একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে আলাদা পরিচিতি দেন।

তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খোলাখুলিভাবে আলোচনা শুরু করেন, দুটি পক্ষের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন, যেখানে এক পক্ষ শুধুই ক্ষমতা ধরে রাখতে চায় এবং অপরদিকে যারা সংস্কারের মাধ্যমে জয় অর্জন করতে চায়।

ভঙ্গুর সময়

১৯৯৭ সালে এশিয়ার আর্থিক সংকটের পরে মালয়েশিয়ার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর পরের বছরই আনোয়ার দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে ড. মাহাথিরকে চ্যালেঞ্জ করেন। ওই চ্যালেঞ্জজুড়ে রাজনৈতিক বিভেদ বা মতাদর্শের লড়াইয়ের চেয়ে বেশি ছিল ব্যক্তিগত আক্রমণ। তবে ক্ষমতার সিঁড়িতে ড. মাহাথির তার দক্ষতা প্রমাণ করায় আনোয়ার ইব্রাহিম সেই চ্যালেঞ্জ জয়ে ব্যর্থ হন।

এরপর আনোয়ারকে মারধর করা হয় এবং এমন অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, যা মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে তীব্র ঝাঁকুনি দেয়।

যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে বিদ্রোহকে কঠোরভাবে দমন করেন মি. মাহাথির। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।

১৯৯৮-৯৯ সালে এমন একটি প্যাটার্ন তৈরি করা হয়, যা দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একটি আকৃতি দেয়।

এরপর আবদুল্লাহ বাদাভি ২০০৪ সালে এবং পরবর্তীতে নাজিব রাজাক ২০১৩ সালে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন সেগুলো তাদেরকে সংস্কারপন্থী হিসেবেই পরিচিতি দিয়েছে। ২০০৩ সালে ড. মাহাথির পদত্যাগের পর আবদুল্লাহ বাদাভি ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তিনি আনোয়ারকে মুক্তি দেন।এ কারণে পরবর্তীতে তিনিও ড. মাহাথিরের রাজনৈতিক ক্রোধের শিকার হন।

প্রথম দিকে আবদুল্লাহ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তিনি তার পার্টির অংশীদার এবং জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে যান। আব্দুল্লাহর পতনকে কাজে লাগিয়ে পুনরায় রাজনৈতিক জীবনে ফিরে এসেছেন ড. মাহাথির।

মাহাথিরের আরেকটি সফল পদক্ষেপ ছিল ২০০৯ সালে নাজিবকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা। ২০০৮ সালে আনোয়ার বিরোধী দলের নেতা হিসেবে সফলভাবে বিভিন্ন দলকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসেন।

নাজিব রাজাক সে সময় ড. মাহাথিরের ভূমিকার পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি আনোয়ারের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ এনে তাকে একটি বিতর্কিত বিচারের মুখোমুখি করেন।

তবে নাজিব রাজাকও শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহর মতো একই ভুল করেন। ব্যর্থ হন জাতীয় নেতৃত্ব ধরে রাখতে।

পরিবর্তনের দিকগুলো

২০১৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজির রাজাকের বিরুদ্ধে গৃহায়ন খাতে দুর্নীতির ওয়ান এমডিবি কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে এবং তার এমন কিছু সম্পদের তথ্য পাওয়া যায় যেগুলো দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা হয়েছে বলে মনে করা হতো।

এ অবস্থায় খোলাখুলিভাবে নাজিব রাজাকের নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করেন ড. মাহাথির। পরে নাজিব রাজাক ড. মাহাথিরের সঙ্গে ব্যক্তিগত আক্রমণে জড়িয়ে যান। তাকে দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি মামলা দায়েরের হুমকি দেন।

আনোয়ারের মতো মাহাথিরকেও একই ফাঁদে ফেলতে চান নাজিব রাজাক।

এ অবস্থায় ২০১২ সালের ডিসেম্বরে মাহাথির বিরোধী দলের সাথে কাজ করতে শুরু করেন এবং নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এ সম্পর্কের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল আনোয়ারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরানো এবং তার মুক্তি ও ক্ষমা নিশ্চিত করা।

নাজিবের পতন, আইনের শাসন পুনর্বহাল এবং রাজনৈতিক সংস্কারের ডাক দেয়ার মাধ্যমে চলতি মাসে ৯২ বছর বয়সী মাহাথির বিরোধীদের জয় ছিনিয়ে নেন।

১৯৯০ সালে আনোয়ারের যে এজেন্ডাগুলো এক সময় সমালোচনার শিকার হয়েছিলো সেগুলোই এখন গ্রহণ করা হচ্ছে সেই ব্যক্তির দ্বারা, যিনি একসময় তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং শাস্তি দিয়েছিলেন।

অবশ্য পুরনো ক্ষত এখনো রয়ে গেছে তবে সেটি একই লক্ষ্য অর্জনের পথে কিভাবে দূর হবে তা পরিষ্কার নয়। ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজনৈতিক সংস্কারের কথা উঠলেও দুজনের মধ্যে মত-ভিন্নতাও রয়েছে যথেষ্ট।

তারপরও অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন মালয়েশিয়ানরা আশা করছেন যে এই দুই নেতা ব্যক্তিগত বিষয় ভুলে দেশের উন্নয়নে একত্রে কাজ করবেন। সূত্র : বিবিসি

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি জাতিসংঘে যাওয়ায় সরকার আতঙ্কিত - ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের এ বক্তব্য সমর্থন করেন কি?