মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

সোমবার, ০৬ নভেম্বর, ২০১৭, ০১:৩৭:২১

৪০০ বর্গফুট দোকানের বিপরীতে ১৪৮ কোটি টাকা ঋণ!

৪০০ বর্গফুট দোকানের বিপরীতে ১৪৮ কোটি টাকা ঋণ!

ঢাকা: পুরান ঢাকার ইংলিশ রোড। চিত্রা সিনেমা হলের পাশে ৪০৫ বর্গফুট সাইজের ৫ নং দোকান, নাম ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ। সাইনবোর্ডে প্লেন শিটের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা লেখা থাকলেও দোকানের ভেতরে নেই তেমন মালপত্র। তিন মাস ধরে কর্মরত কর্মচারী গোলাম মো. টনি জানান, মালপত্র না থাকায় বিক্রিরও চিন্তা নেই। দোকানের মালিক কে, তাও জানেন না তিনি।
আশপাশের দোকানগুলোয় খবর নিয়ে জানা যায়, চার-পাঁচ বছর ধরে ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ এসব দোকান থেকে বাকিতে মালপত্র নিয়ে বিক্রি করে আসছে। অনেকের অর্থ আটকে আছে এ প্রতিষ্ঠানের কাছে।
ইংলিশ রোড আয়রন অ্যান্ড স্টিল মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজের কাছে। অ্যাসোসিয়েশনের দফতর সম্পাদক আবু তাহের বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আশপাশের দোকান থেকে বাকিতে মালপত্র নিয়ে বিক্রি করে এলেও অর্থ শোধ করছেন না ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ। মালিককেও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিপদে রয়েছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।
ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজের নাম ব্যবহার করেই স্বত্বাধিকারী ওয়াহিদুর রহমান বেসিক ও কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন ১৪৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা; যার পুরোটাই এখন খেলাপি।
নিজে খেলাপি গ্রাহক হলেও থেমে ছিল না ওয়াহিদুর রহমানের নতুন ঋণ গ্রহণ। ঋণ নেয়ার যত অপকৌশল, তার সবই খাটিয়ে চৌকস নজির রেখেছেন এ ব্যবসায়ী। প্রধান পরিচয় অটো ডিফাইনের স্বত্বাধিকারী। তবে ঋণ হস্তগত করতে স্ত্রীর হাতে মালিকানা দিয়ে নিজে খুলেছেন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, খুলিয়েছেন নিজস্ব কর্মকর্তাদের নামেও। বণিক বার্তার নিজস্ব এক অনুসন্ধানে এ ব্যবসায়ীর প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ঋণ অনুমোদনকারী ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা, যার পুরোটাই এখন খেলাপি।
অধুনালুপ্ত ওরিয়েন্টাল ব্যাংক (বর্তমানে আইসিবি ইসলামিক) থেকে ২০০৬-০৭ সালে ঋণ নিয়ে আলোচনায় আসেন এ ব্যবসায়ী। ব্যাংকটি থেকে ঋণ নিতে ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ, পলাশ এন্টারপ্রাইজ, মাসুদ ট্রেডিং ও ইউনাইটেড ট্রেডিং নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খোলেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর নাম দেখানো হয় জনৈক সালাউদ্দিন, তাজউদ্দিন ও আলী আশরাফের। ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজের একটি ঋণে সালাউদ্দিনের নাম ব্যবহার করা হলেও আরেকটিতে নিজের নাম ব্যবহার করেন তিনি। অন্য ঋণগুলোর বিভিন্ন স্তরে ওয়াহিদুর রহমানের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ রকম ১২টি হিসাব অটো ডিফাইনের নামে একীভূত করে। ব্যাংকটিতে ওয়াহিদুর রহমানের নামে অটো ডিফাইন ছাড়াও ওয়েস্টার্ন গ্রিল, ডেং ডি লায়ন রেস্টুরেন্ট ও ফিয়াজ ট্রেডিংয়ের নামে ঋণ রয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের বংশাল শাখায় ওয়াহিদুর রহমানের ৬৫ কোটি টাকার দেনা রয়েছে।
জানা যায়, ওয়াহিদুর রহমান নিজে বেসিক ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় খেলাপি গ্রাহক। আরো ঋণ নেয়ার কৌশল হিসেবে তিনি কর্মচারী এবি রাসেলের নামে নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যাংকটির গুলশান শাখা থেকে ঋণ নিয়েছেন। অবৈধ ঋণ সুবিধা পেতে অটো ডিফাইনের মালিকানায় পরিবর্তন এনে বসিয়েছেন স্ত্রী আসমা খাতুনকে। নিজে নিউ অটো ডিফাইন নামে প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণ সুবিধা নিয়েছেন।
বেসিক ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় খেলাপি হওয়ার পর তিনি নিজের নামে ২০১০ সালে নিউ অটো ডিফাইন নামে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। আর কাগজে-কলমে খেলাপি প্রতিষ্ঠান অটো ডিফাইনের মালিকানায় আনেন তার স্ত্রী আসমা খাতুনকে। ঋণ অনুমোদনের কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবি রাসেলের নামে ২০১১ সালে এবি ট্রেড লিংক নামে নতুন প্রতিষ্ঠান খোলেন। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা হিসেবে ধানমন্ডির একটি হোল্ডিংয়ের কথা উল্লেখ করা হলেও সেখানে কোনো অফিস পাওয়া যায়নি। এবিএম রাসেল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধি দলকে লিখিতভাবে জানান, তিনি অটো ডিফাইনের কর্মচারী। তার নামে ঋণ নেয়া হলেও ওয়াহিদুর রহমান এ অর্থ জমি কেনার কাজে ব্যবহার করেছেন। ব্যাংকটির গুলশান শাখা এবি ট্রেড লিংকের ৬৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে; যার নম্বর ২৩/২০১৪। এছাড়া একই প্রতিষ্ঠানের ৪৫ কোটি টাকার চেক ডিজঅনার হওয়ায় চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা চলছে। সর্বশেষ হিসাবে ওয়াহিদুর রহমানের কাছে ব্যাংকটির পাওনা দাঁড়িয়েছে ২০৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। নিউ অটো ডিফাইনের ৮৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে বেসিক ব্যাংক, যার নম্বর ২১৬/২০০৩।
বেসিক ব্যাংকের ডিএমডি মো. সেলিম  বলেন, এসব ঋণ কঠোর তদারকির মধ্যে রাখা হয়েছে। ঋণ আদায়ে আইনি পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রেখে ঋণ আদায়ের চেষ্টা চলছে।
আলোচিত এ গাড়ি ব্যবসায়ীর সঙ্গে এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান অটো ডিফাইনের ব্যবস্থাপক মো. জাহিদ যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। তবে এক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ওয়াহিদুর রহমান সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন।
কর্মচারী এবিএম রাসেলের নাম ব্যবহার করে দি সিটি ব্যাংক থেকেও ঋণ নিয়েছেন ওয়াহিদুর রহমান; যার পুরোটাই (৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা) এরই মধ্যে মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণীকৃত হয়েছে। এর মধ্যে ট্রায়ো হলোগ্রাম ইন্ডাস্ট্রিজের ৫ কোটি ও বাকিটা কর্মচারী এবিএম রাসেলের নামে। ওয়াহিদুর রহমান প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা পরিশোধের অঙ্গীকার করে পুনর্তফসিল করার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান পরিচালন ও যোগাযোগ কর্মকর্তা মাশরুর আরেফিন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা জমা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এভাবে তারা ঋণটি নিয়মিত করে পরিশোধ করতে চায়।
যদিও ওয়াহিদুর রহমানের ভাগ্নে ও ফিয়াজ গ্রুপের ম্যানেজার (অপারেশন) তাজুল ইসলাম বলেন, এবি ট্রেড লিংক নামে তাদের কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। এমনকি সিটি ব্যাংকেও কোনো ঋণ নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তথ্যাদিতে এর সত্যতা মেলেনি।
এদিকে এবি ট্রেড লিংকের ঋণের ক্ষেত্রে যেসব জমি বন্ধক রাখা হয়েছিল, অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এগুলোর মালিকানা অন্যের। ঋণের বিপরীতে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বড়ইছুটি মৌজার সাবেক ৪৫১, আরএস ১৫৩, সিএস ৬৩, এসএ ১৪, আরএস ৪৯, সিএস এবং এসএ ১০১, ১১৬, ১৩৬, ১৩৭, ২৯৩, ১৩৯, ৯৬, আরএস ১১৮, ১৩৯, ১৬২, ১৬৩, ৩১৬, ১১২, ও ১৬৫ দাগে মোট ৫১৭ শতাংশ জমি বন্ধকি হিসেবে গ্রহণ করে বেসিক ব্যাংক। কিন্তু এবি ট্রেড লিংক ভুয়া প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ও ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা না থাকায় বন্ধকি এ জমি নিলামে তোলার আয়োজন করছে বেসিক ব্যাংক। তবে সরেজমিনে পরিদর্শন ও ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, আশুলিয়ার নন্দন পার্কের পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে নিলামকৃত এ জমির প্রকৃত মালিক ওয়াহেদ আলী, সিপার উদ্দিন, আমান উদ্দিন, সাহাজ উদ্দিন, মোকছেদ আলী, ফাতেহা খাতুন ও কয়েদা আলী গং। দীর্ঘদিন ধরে তারা এ জমি ভোগ-দখলও করে আসছেন। কালিয়াকৈর উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়ন ভূমি উপসহাকারী কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিন জানান, ওই জমির বৈধ মালিক ওয়াহেদ আলী গং।বণিক বার্তা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওয়াহিদুর রহমান খেলাপি থাকার তথ্য গোপন করে ২০১০-১১ অর্থবছরে কৃষি ব্যাংকের বনানী শাখা থেকেও ঋণ নিয়েছেন, যার পরিমাণ এখন দাঁড়িয়েছে ১২৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর পুরোটাই এরই মধ্যে মন্দ ঋণের খাতায়। এ ঋণের মধ্যে ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজের নামে ৫৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, অটো ডিফাইনের ৩৬ কোটি ৪৭ লাখ ও ফিয়াজ ট্রেডিংয়ের নামে ৩২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এসব ঋণ এক বছরের বেশি সময় ধরে খেলাপি থাকার পর সম্প্রতি নিয়মিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করে ঋণ পুনর্তফসিলের আবেদন করা হয়েছে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে আরো ৮০ কোটি টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বাকি অর্থ বন্ধকির মাধ্যমে নিরাপদ আছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জয়নাল আবেদীন। তিনি বলেন, অর্থ আদায়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আলোচনা চলছে। কিছু অর্থ তারা জমা দিয়েছে। কিছু পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ব্যাংকবহিভূর্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি থেকেও কৌশলে অর্থ নিয়েছেন ওয়াহিদুর রহমান। এ প্রতিষ্ঠানে তাদের দেনা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে অটো ডিফাইনের নামে ১ কোটি ৯৩ লাখ ও বাকিটা নিজের নামে। এ ঋণও খেলাপি হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, ‘নিয়ম ভেঙে ঋণ দেয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মানে শ্রেণীকৃত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এখন অর্থ উদ্ধার করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের। কোনো কোনো ব্যাংক আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে, আবার কেউ অন্যভাবে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরাও বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছি।’

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি জাতিসংঘে যাওয়ায় সরকার আতঙ্কিত - ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের এ বক্তব্য সমর্থন করেন কি?