Prime News bd.com is about bangla newspaper, news dhaka, bangla online news, news in bangla
Print
প্রচ্ছদ » অর্থ বাণিজ্য
Wed, 11 Jan, 2017

কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি প্রগতি লাইফের

ঢাকা: রাজস্ব ফাঁকি, কমিশনে অনিয়ম, হিসাবে গড়মিল, সম্মেলনের নামে আর্থিক অনিয়ম, পরিচালকদের অনৈতিক সুবিধা, এজেন্ট ও এমপ্লয়ার অব এজেন্ট প্রশিক্ষণ ব্যয়ে অনিয়মসহ নানাবিধ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে জীবন বীমা কোম্পানি প্রগতি লাইফের বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের কারণে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন গ্রাহকরা। এতে একদিকে হচ্ছে আইন লঙ্ঘন, অন্যদিকে মানি লন্ডারিংয়ের আশঙ্কা। প্রতিষ্ঠানটির এসব অনিয়মের তথ্য নিয়ে জাগো নিউজের সাত পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব।

সরকারের দেড় কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। গ্রুপ ব্যবসা সংগ্রহের ফির ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বিধিমালা মোতাবেক ব্যাংকের সার্ভিস চার্জের ওপর সঠিকভাবে ভ্যাট পরিশোধ না করে এ রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে।

পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের লেনদেনেও ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব সমন্বয় করায় প্রতিষ্ঠানটিতে মানি লন্ডারিং হওয়ার আশঙ্কা করছে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।

প্রগতি লাইফের ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালের আর্থিক অবস্থা খতিয়ে দেখে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূরুল ফারুক হাসান অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস যে নিরীক্ষা প্রতিবেদন দিয়েছে, তার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এমন আশঙ্কা করছে আইডিআরএ।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ এই তিন বছরে ব্যাংক সার্ভিস চার্জের ওপর অপরিশোধিত ভ্যাটের পরিমাণ ১ কোটি ৫৬ লাখ ৭৯ হাজার ২৬২ টাকা। এর মধ্যে ২০১২ সালের ৬৬ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫ টাকা, ২০১৩ সালের ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫ এবং ২০১৪ সালের ৪০ লাখ ৪৩ হাজার ১৮২ টাকা রয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, প্রগতি লাইফের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ভ্যাটের টাকা নির্ধারিত হিসাবে জমা করা সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রগতি লাইফ ১ কোটি ৫৬ লাখ ৭৯ হাজার ২৬২ টাকা ভ্যাটের বিপরীতে কোনো ট্রেজারি চালান দেখাতে পারেনি।

আইডিআরএ বলছে, গ্রুপ ব্যবসা সংগ্রহের ফির ওপর ভ্যাট বিধিমালা ১৯৯১ এর ১৮ (ঙ) বিধি মোতাবেক ব্যাংকের সার্ভিস চার্জের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কর্তন করতে হয়। কিন্তু প্রগতি লাইফ ভ্যাট বিধিমালার এ বিধির শর্ত মেনে ভ্যাট না কেটে ভ্যাট আইন লঙ্ঘন করেছে। এতে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অপরদিকে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী, ১ কোটি ৫৬ লাখ ৭৯ হাজার ২৬২ টাকা ভ্যাটের বিপরীতে কোনো ট্রেজারি চালান দেখাতে না পারায় প্রতীয়মান হয় যে, এ টাকা থেকে কর কেটে জমা করা হয়নি; যা বীমা আইন ২০১০ এর ২৯ (২) ধারা পরিপন্থী বলছে আইডিআরএ।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রগতি লাইফে কমিশনের টাকা প্রিমিয়াম থেকে সমন্বয় করা হয়েছে, অর্থাৎ প্রিমিয়াম থেকে নগদে পরিশোধ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে কোম্পানির এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে অভ্যন্তরীণ তহবিল স্থানান্তরের মাধ্যমে সমন্বয় করা টাকা ব্যাংকে রক্ষিত প্রিমিয়াম সংগ্রহ হিসাবে জমা করে জমার হিসাব হালনাগাদ করা হয়।

বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে, এ ধরনের সমন্বয়ের কারণে মানি লন্ডারিংয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি আইডিআরএ’র জারি করা প্রজ্ঞাপনের (লাইফ-২/২০১২) নির্দেশনা এবং বীমা আইন ২০১০ এর ২৬(২) ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে। আর কমিশনের টাকা নগদে পরিশোধের কারণে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ৩০ (এম) ধারা অনুযায়ী কোম্পানির আয়করের দায় বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রগতি লাইফ আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ৫৩ (জি) ধারা লঙ্ঘন করেছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই ধারা অনুযায়ী কমিশনের ওপর ৫ শতাংশ হারে কর কেটে তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত হিসাবের কোডে জমা করতে হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তা করেনি।

৫৩ (জি) ধারা অনুযায়ী, ২০১২ সালের কমিশনের ওপর থেকে ২ কোটি ৮৩ লাখ ৬৫ হাজার ৩১৫ টাকা কর বাবদ কেটে বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত হিসাবের কোড জমা করার কথা। কিন্তু বছরটিতে কমিশনের ওপর থেকে কর বাবদ কাটা হয় ২ কোটি ৭৬ লাখ ১৮ হাজার ৪১৫ টাকা। অর্থাৎ কমিশন থেকে ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৯০০ টাকা কর কম কাটা হয়েছে।

একইভাবে পরের বছর ২০১৩ সালে কমিশনের ওপর ৫৩ (জি) ধারা অনুযায়ী করের পরিমাণ হওয়ার কথা ৮২ লাখ ৬০ হাজার ৮৪৫ টাকা। অথচ সেখানে কর বাবদ কেটে রাখা হয় ৮২ লাখ ৩৫ হাজার ৭২২ টাকা। অর্থাৎ ২৫ হাজার ১২৩ টাকা কর কম কাটা হয়।

অবশ্য ২০১৪ সালে ৫৩ (জি) ধারা অনুযায়ী কমিশন থেকে যে পরিমাণ কর কাটার কথা তার থেকে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬৪২ টাকা বেশি কাটা হয়। বছরটিতে কর বাবদ ১ কোটি ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৪৫৩ টাকা কাটার কথা, কিন্তু কেটে রাখা হয় ১ কোটি ৩৮ লাখ ৩ হাজার ৯৬ টাকা।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরো উঠে এসেছে, ২০১২ সালে পুরস্কার বাবদ ৩৪ লাখ ৬৩ হাজার ৯৫ টাকা, ২০১৩ সালে ১৬ লাখ ৯ হাজার ৪৭৩ এবং ২০১৪ সালে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ১৯ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এ টাকার সম্পূর্ণ অংশই কোম্পানি থেকে নগদে দেয়া হয়, যা আইডিআরএ’র নির্দেশনার পরিপন্থী।

পাশাপাশি নগদে পরিশোধের কারণে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ৩০ (এম) ধারা অনুযায়ী কোম্পানির আয়করের দায় বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মাত্রাতিরিক্ত বীমা পলিসি তামাদি, অফিস ভাড়ায় অনিয়ম, মাত্রাতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়, গাড়ি ক্রয় ও ব্যবহারে অনিয়ম, লভ্যাংশ প্রদানে অনিয়ম, বিনিয়োগে অনিয়মসহ নানাবিধ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে প্রগতি লাইফের বিরুদ্ধে।

নানাবিধ এসব অনিয়মের কারণে লঙ্ঘিত হচ্ছে বীমা আইন, বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (বিএএস), মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বিধিমালা ১৯৯১ এবং আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪।

এসব অনিয়ম-অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রগতি লাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জালালুল বলেন, আমরা এ ধরনের কোনো অনিয়ম করিনি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে তা সঠিক নয়।

তিনি বলেন, নিয়ম হলো নিরীক্ষক প্রতিবেদন দেয়ার আগে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে বসবে। কিন্তু এই নিরীক্ষক আমাদের ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে না বসে একতরফা রিপোর্ট দিয়েছে। তারা বলেছে আইডিআরএ’র নির্দেশ আছে আপনাদের সঙ্গে বসা যাবে না এবং কোনো কথা বলা যাবে না।জা:নি