বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:২৫:১৩

ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে বিব্রত আওয়ামী লীগ

ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে বিব্রত আওয়ামী লীগ

ঢাকা: ছাত্রলীগের একের পর এক নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে বিব্রত আওয়ামী লীগ। আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সংঘর্ষ হচ্ছে। একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হচ্ছেন কেউ কেউ। এ ছাড়া অপহরণ, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার খবর এখন মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত এক ছাত্রীকে হলের রুমে ডেকে নিয়ে রগ কাটার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বইছে নিন্দার ঝড়। এভাবে প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়ায় অনেকটা বিরক্ত হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। ফলে এখনই ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরা দরকার বলে মনে করছেন দল ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা।

দলটির নেতারা মনে করেন, ছাত্রলীগের একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু সেই ইতিহাস ঐতিহ্যে এখন ভাটা পড়েছে। তাদের নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে সরকারের উন্নয়ন ও অর্জনে দাগ পড়ছে। আওয়ামী লীগ সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, বিরোধী দলে থাকাবস্থায় রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রলীগ আর বর্তমান ছাত্রলীগে অনেক পার্থক্য আছে। এখন যারা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা শুধু ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত। শুধু খাই খাই মনোভাব ছাড়া আর কিছু দেখি না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হয়েই ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে ২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ নেতাদের সতর্কও করেছেন বহুবার। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বলেন, ছাত্রলীগ যখন পত্রিকায় অপকর্মের শিরোনাম হয় তখন সরকারের সব অর্জন ম্লান হয়ে যায়। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হলের সিট ও রুম ভাগাভাগি বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া সংগঠনটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে গিয়েও তিনি ছাত্রলীগের এমন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন একাধিক বার। কিন্তু তাতে কোনো ফল আসেনি।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেয়ায় মঙ্গলবার মধ্য রাতে উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগ চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী মোর্শেদা আক্তারকে নিজের রুমে ডেকে নিয়ে যান কবি সুফিয়া কামাল হল ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান এশা। পরে তাকে মারধর ও একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পায়ের রগ কেটে দেন এশা। অপর এক ছাত্রীর মাথায়ও আঘাত করা হয়। এ ঘটনায় ওই নেত্রীকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তাকে বহিষ্কার করেছে। গত ৩১ মার্চ চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের ড. জাহেদ খানের কার্যালয়ে ঢুকে তাকে লাঞ্ছিত করেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি ও তার অনুসারীরা। কোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠে।

চাঁদা দিতে না পারায় গত ৪ এপ্রিল মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদফতর কার্যালয়ে হামলা চালায় পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি রনি মাতুব্বর ও তার লোকজন। ওই সময় চেয়ারটেবিল ভাঙচুর করা হয়। গত ১ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ে আলিয়া মাদরাসা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় গত ৩ এপ্রিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রলীগ কমিটির সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। একই দিনে ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের সরকারি হারিচ রোকেয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শিউলী রানীকে ছাত্রলীগ নেতা এনাম হাওলাদার দরজা বন্ধ করে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে ধর্ষণের চেষ্টা করে। উপজেলা ছাত্রলীগের এই সহসভাপতি ওই স্কুলের ছাদ দখল করে দীর্ঘদিন বসবাস করছেন বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ রয়েছে। এর আগের দিন গত ২ এপ্রিল শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায় এক কিন্ডারগার্টেনের কিশোরী আয়াকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ছাত্রলীগ নেতা এনামুল হক। তিনি নলমুড়ি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের উপক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক হাসিবুর রহমান তুষারের ইয়াবা সেবনের ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। তবে তিনি গণমাধ্যমের কাছে বিষয়টি অস্বীকার করেন। এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়া পল্টনের নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে ইয়াবাসহ বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি রঙ্গনসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশ। সম্প্রতি মাদক ব্যবসায়ীদের ৩৮ জনের একটি তালিকা করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই তালিকায় ২০ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।

গত বছরের ১৪ জুন টেন্ডার নিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) ছাত্রলীগের সভাপতি নাজমুল হক ও সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ দাসের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। গত বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। যার নেপথ্যে ৫১ কোটি টাকার টেন্ডার ছিল বলে সূত্র জানায়। গত বছর গুলিস্তানে হকারদের সাথে সংঘর্ষের সময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেন প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করে। এভাবেই দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ। বিতর্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না তাদের।

আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন নবলেন, বর্তমানে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কালচার তাতে বক্তব্য দেয়াও কঠিন। নেতাকর্মীদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে দলের ভাবমর্যাদা নষ্ট হয়, দল বিব্রতবোধ করে। প্রধানমন্ত্রী এসব ব্যাপারে সব সময় সিরিয়াস থাকেন। তবে যারা ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করেন তারা মাঝে মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন। এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, যেসব এলাকায় ছাত্রলীগের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বেশি সেসব এলাকায় আগামী নির্বাচনে প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে সময় থাকতে আমাদের সতর্ক হতে হবে।

আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য নূহ উল আলম লেনিন বলেন, ছাত্রলীগের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে অবশ্যই প্রভাব পড়ে। পুলিশের কাজ পুলিশ করবে। পুলিশের কাজ অন্য কেউ যদি করে তাহলে তো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবেই। কাউকে তো আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বলা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. রেজাউল কবির বলেন, পরাধীন রাষ্ট্রের শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছাত্র রাজনীতির আবির্ভাব। কিন্তু বর্তমানে ছাত্র রাজনীতিকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে; যা কখনো কাম্য নয়। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রলীগের একটি ঐতিহ্য আছে। সেই ছাত্রলীগ যদি নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য সংবাদের শিরোনাম হয় তাহলে আমাদের খারাপ লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। অভ্যন্তরীণ কোন্দল মারামারি হানাহানি বন্ধ করতে হলে ছাত্রলীগের জেলাপর্যায়ের সব সম্মেলন নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বন্ধ করতে হবে। ছাত্রলীগকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।

আজকের প্রশ্ন

খুলনা সিটি নির্বাচনের ভোটকে ‘প্রহসন’ বলেছেন বিএনপি ও বামপন্থিরা। আপনি কি একমত?