সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

সোমবার, ১৪ মে, ২০১৮, ০৫:১৭:২৬

ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসে

ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসে

চট্টগ্রাম: ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। দলিলাদি নোটিং থেকে পণ্য খালাস পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে অতিরিক্ত অর্থ (ঘুষ) দিতে হয়। ডেলিভারির সুবিধার্থে ঘুষ প্রদান করা না হলে ডেলিভারি দেরি হয়। টাকার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট নয়, ক্ষেত্রবিশেষে এক হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। তাছাড়া বন্দরের সব পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউজের ওপর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালিত এক জরিপে এ চিত্র উঠে আসে। তবে জরিপে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করেনি দুদক।
গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে দুদকের পরিচালিত এই জরিপে অংশগ্রহণ করেন কাস্টমস ও বন্দর ব্যবহারকারী ৪৫ ব্যক্তি। এতে ছিলেন ৩৬ আমদানিকারক, তিন রফতানিকারক, পাঁচ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও এক ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স। চলতি মাসের ১০ তারিখে জরিপের ফলাফল কাস্টমসের কাছে তুলে ধরে দুদক।
গত সপ্তাহে বুধবার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের অডিটরিয়ামে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউজের দুর্নীতিমুক্ত ও মানসম্মত সেবা প্রদান বিষয়ে কর্মশালায় এই জরিপ সম্পর্কে দুদক কমিশনার ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ বলেন, এই জরিপের উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম বন্দর ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের দুর্নীতিমুক্ত ও মানসম্মত সেবা প্রদান নিশ্চিত করা। এছাড়া বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউজের অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে এক সপ্তাহের মধ্যে সমন্বয় কমিটি করার নির্দেশও প্রদান করেন তিনি।
দুদকের পরিচালিত এই জরিপে ছয়টি প্রশ্ন রাখা হয়। প্রথমে প্রশ্ন ছিল আপনি কী ধরনের পণ্য আমদানি বা রফতানি করেন? এরপর প্রশ্ন রাখা হয় আমদানি পণ্য খালাস ও রফতানি পণ্য শিপমেন্ট প্রক্রিয়ায় কাস্টমস এবং বন্দরের কোনো পর্যায়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন কি না? কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী দ্বারা আপনি হয়রানির শিকার হচ্ছেন? সরকারি রাজস্ব ছাড়া অতিরিক্ত (ঘুষ) টাকা প্রদান করতে হয় কি না এবং টাকা প্রদান করতে হলে কোন পর্যায়ে কত টাকা প্রদান করতে হয়? এছাড়া নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময় অপচয় হয় কি না; হয়ে থাকলে কেন এবং কোন পর্যায়ে কতটুকু হয়? তাছাড়া জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে সমস্যা সমাধানের মতামত ও সুপারিশ চাওয়া হয়।
আমদানি পণ্য খালাস প্রক্রিয়ায় কাস্টমস এবং বন্দরের কোন পর্যায়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন এ প্রশ্নের বিপরীতে ৮০ শতাংশের বেশি নেতিবাচক মতামত আসে। এছাড়া ৮৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মতামত জানান, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সার্ভারের ধীরগতি; ৮৪ শতাংশ মত জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারের ত্রুটি ও একটিমাত্র বণিজ্যিক ব্যাংকের উপস্থিতি; ৮২ শতাংশ মতামত জানান, রাসায়নিক পরীক্ষাগারের কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতি রয়েছে। বন্দরের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকার ব্যাপারে নেতিবাচক মতামত জানান ৮৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। এদিকে কাস্টমস ও বন্দর কর্মচারী ও কর্মকর্তা দ্বারা বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানির বিষয়ে নেতিবাচক ফলাফল আসে ৮১ শতাংশ। বহিনোঙরে জাহাজ আসার পর বার্থিং পেতে সমস্যা ও দ্রুত বার্থিং পেতে দুর্নীতি হয় ৮০ শতাংশ। কায়িক পরীক্ষায় অতিরিক্ত সময় ক্ষেপণ হয় বলে ৮০ শতাংশের অভিযোগ। বন্দরে এলসিএল কনটেইনারে আমদানি করা পণ্য আনস্টাফিংয়ে সময়ক্ষেপণ হয় ৭৮ শতাংশ। বন্দর ও কাস্টমসের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে অতিরিক্ত (ঘুষ) টাকা লেনদেনের পক্ষে মতামত জানান ৭২ শতাংশ। এছাড়া শিপিং এজেন্টদের স্বেচ্ছাচারিতা এবং বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে জানান ৬০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
এদিকে রফতানি পণ্য শিপমেন্ট প্রক্রিয়ায় কাস্টমস ও বন্দরের কোন পর্যায়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে উঠে আসে সার্ভারের ধীরগতির কথা ৮৬ শতাংশ, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইনের সমস্যা ৮০ শতাংশ এবং কাস্টমস সার্ভারে ইএক্সপি ফর্মসংক্রান্ত তথ্যাদি যথাসময়ে পাওয়া যায় না বলে জানান ৮২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। রফতানি পণ্য শিপমেন্ট করার সময় টাকা ছাড়া রফতানি ডকুমেন্ট শুল্কায়ন সম্ভব হয় না বলে সমপরিমাণ মতামত আসে। বন্দরে বিভিন্ন স্থানে হয়রানি ও কালক্ষেপণের ফলে নির্দিষ্ট জাহাজে পণ্য শিপমেন্ট বাধাগ্রস্ত হয়। এদিকে ৮০ শতাংশ মতামত আসে বন্ধের দিনে অথরাইজ ডিলার (এডি) ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ থাকায় রফতানিযোগ্য পণ্য রফতানিতে সময়ক্ষেপণ হয়। তাছাড়া আইসিডিতে পণ্য সময়মতো আনলোড না হওয়ায় পক্ষে মতামত জানান ৭৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।

কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী দ্বারা আপনি হয়রানির শিকার হচ্ছেন এ প্রশ্নের উত্তরে সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন ৮২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। শুল্ক গ্রহণে নিয়োজিত সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী, অদক্ষ ফর্ক লিফট ও ক্রেন ড্রাইভারের বিপক্ষে ৭৮ শতাংশ মতামত আসে। পণ্য পরীক্ষার পর্যায়ে ডিসি, এসি ও এআইআর যথাসময়ে উপস্থিত না হওয়ায় ডেলিভারি পর্যায়ে হাইস্টার, ক্রেন, এস/সি অপারেটরদের অসহযোগিতা ও হয়রানি হয় ৬৮ শতাংশ।
অন্যদিকে সরকারি রাজস্ব ছাড়া অতিরিক্ত (ঘুষ) টাকা প্রদান করতে হয় কি না এবং টাকা প্রদান করতে হলে কোন পর্যায়ে কত টাকা প্রদান করতে হয় এ দুই প্রশ্নের জবাবে ৮৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানান, দলিলাদি নোটিং থেকে পণ্য খালাস পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। বন্দরের সব পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বলে জানান ৬০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। টাকার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট নয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষে বন্দর ও কাস্টম হাউজে এক হাজার থেকে পাঁচ-দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয় বলে মতামত প্রদান করেন ৬২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। পরীক্ষাগার, শুল্কায়ন ও সোনালী ব্যাংকের অতিরিক্ত টাকা প্রদান করতে হয়, তবে টাকার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট নয় এমন উত্তর আসে ৪৮ শতাংশ। ডেলিভারির সুবিধার্থে অতিরিক্ত টাকা প্রদান করতে হয়, না হলে ডেলিভারি দেরি হয় বলে সমপরিমাণ মতামত আসে।
নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময় অপচয় হয় কি না, হয়ে থাকলে কেন ও কোন পর্যায়ে কতটুকু হয় এমন প্রশ্নের জবাবে ঘুরে-ফিরে আগের প্রশ্নগুলোর মতো ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নেতিবাচক উত্তর এলেও নতুন দুটি পয়েন্ট উঠে আসে মতামতে। এতে কাস্টমস ও বন্দর ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকলেও সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট এবং ব্যাংক বিকাল ৫টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের মাঝে ডেলিভারি রিপোর্ট পেতে সমস্যা হয় বলে জানায় ৬২ শতাংশ মতামত প্রদানকারী। এছাড়া পণ্যের আর্ট নম্বর, কেমিক্যালের নাম, সংজ্ঞা প্রভৃতি ব্যাপারে আরও-এআরও’দের ধারণা না থাকায় সময়ের অপচয় হয় বলে জানান ৫৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
সর্বশেষ সমস্যা সমাধানের মতামত ও সুপারিশে অংশগ্রহণকারীরা জানান, কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সার্ভারের আপগ্রেড করতে হবে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের নিজস্ব সার্ভার স্থাপন করার পক্ষে মতামত প্রকাশ করেন ৯০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। চট্টগ্রাম বন্দরে হাইস্টার ও ক্রেন অপারেটরদের কাজের তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। ইকুইপমেন্ট স্বল্পতা পূরণ ও প্রত্যেক শুল্কায়ন সেকশনে কর্মকর্তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসসংশ্লিষ্ট আগ্রাবাদ এলাকায় সব ব্যাংক ও শিপিং এজেন্ট কমপক্ষে রাত ৮টা পর্যন্ত সপ্তাহে সাত দিন খোলা রাখার ব্যবস্থা করা, অনলাইনে সব দফতরের ইন্সপেকশন সার্টিফিকেট পাওয়্যার ব্যবস্থা করা, সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তার মাধ্যমে পণ্য নোটিং করা, পণ্য ডেলিভারিতে ৪৮ ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি বিভাগে আলাদা মানিটরিং সেল গঠন করা প্রভৃতি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কমিশনার ড. একেএম নুরুজ্জমান বলেন, ‘দুদকের এই জরিপকে আমি সাধুবাদ জানাই। তবে জরিপে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার নাম উঠে আসেনি। যদি কারও নাম উঠে আসত তাহলে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। এছাড়া ওই জরিপে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের আরও অংশগ্রহণ দরকার ছিল। কারণ আমদানিকারকরা সরাসরি কাস্টম হাউজে আসেন না। এতে মধ্যখানে একটা ফাঁকি থেকেই যায়। তাছাড়া প্রতিটা কর্মকর্তাকে কাজকে ইবাদত হিসেবে নিতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক এ প্রসঙ্গে বলেন, যে সেক্টরগুলো নিয়ে কথা উঠেছে সেগুলোর ক্ষেত্রে নিজ নিজ বিভাগভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া আমাদের নিয়মিত মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে।
উল্লেখ্য, দেশের আমদানি-রফতানির ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়ে থাকে। আর পুরো দেশে জাতীয় রাজস্ব আহরণের ৩৩ শতাংশ জোগান দিয়ে থাকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। যেহেতু আমদানি-রফতানির বৃহৎ কার্যক্রম এই দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাই নানা সময় কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতি পরিলক্ষিত হয়। এতে যেমন জড়িত দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু কর্মকর্তা, তেমনি জড়িত আছেন একাধিক অসাধু ব্যবসায়ী।

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি জাতিসংঘে যাওয়ায় সরকার আতঙ্কিত - ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের এ বক্তব্য সমর্থন করেন কি?