মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

বুধবার, ২৭ জুন, ২০১৮, ০২:১২:১৯

রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সঙ্কট ও সম্ভাবনা : খাদের কিনারে দেশ

রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সঙ্কট ও সম্ভাবনা : খাদের কিনারে দেশ

ঢাকা: বাংলাদেশের রাজধানী শহর বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে তালিকার সর্বনিম্ন স্থানে অন্তর্ভুক্ত। এটি পুরনো খবর। বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের রাজধানী শহরটি বসবাসের অযোগ্য বিশ্ব তালিকায় প্রথম দিকে স্থান পাচ্ছে। এক সময় দুর্নীতির সূচকে আন্তর্জাতিক র‌্যাটিংয়ে বাংলাদেশ পর পর বেশ কয়েকবার প্রথম স্থান পেয়েছিল। এ নিয়ে দেশে রাজনৈতিক বেøইম গেম এখনো চলছে। তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার বছর ২০০১ সালে প্রথম দুর্নীতির আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশ প্রথম স্থান লাভ করে। তবে সে বছরের দুনর্সীতির তথ্য-উপাত্তের সূচকগুলো নির্ধারিত হয়েছিল আগের বছরের(২০০০সাল) হিসাবে, তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামীলীগ সরকার। অর্থাৎ আওয়ামীলীগের সময় শুরু হওয়া দুর্নীতি পরবর্তী জোট সরকারের সময় অব্যাহত ছিল। পরবর্তিতে দুর্নীতির আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থানগত পরিবর্তন ঘটলেও টাকার অঙ্কে ও সুশাসনের মানদন্ডে দুর্নীতি কমেছে, এমন দাবীর কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। প্রভাবশালী মহলের সিন্ডিকেটেড দুর্নীতির কারণে দেশের শেয়ার বাজারে ধস নেমে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার কোন বিচার হয়নি। লুটপাট হওয়া অর্থের কোন হদিস পাওয়া যায়নি। সেই সাথে গত এক দশকে দেশ থেকে অন্তত ৬ লক্ষকোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে সরকারী বেসরকারী ব্যাংকগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের নিরাপদ সেক্টরে পরিনত করে ব্যাংকগুলোকে কার্যত দেউলিয়া করে ফেলা হয়েছে। পুঁজিবাজার আর ঘুরে দাড়াতে পারেনি। সরকারী ব্যাংকগুলো লুটপটের শিকার হওয়ার পর দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের প্রতি গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে। ডাকসাইটে আওয়ামী নেতা ও তথাকথিত অর্থনৈতিক ত্বাত্তি¡কদের হাতে পড়ে কোন কোন সরকারী ব্যাংকের অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, এসব ব্যাংক এখন বেসরকারী বিনিয়োগে তো কোন অবদান রাখতে পারছেইনা, উপরন্ত তারা গ্রাহকদের আমানতও ফেরত দিতে পারছেনা। অন্তত ৯টি ব্যাংক মূলধন ভেঙ্গে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়। ব্যাংকিং সেক্টরের এমন বিপর্যয় একদিনেই সংঘটিত হয়নি। ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক নিয়োগ, নজরদারি ও আইনগত বিধিবিধান বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যর্থতা ও অস্বচ্ছতাসহ নানাবিধ কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ধস নামার সময়েও যে দু’য়েকটি বেসরকারী ব্যাংক সুনাম ও সাফল্যের সাথে কোটি গ্রাহকের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক সম্ভবত: তার অন্যতম। শ্রেফ রাজনৈতিক কারণে আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে একমাত্র এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় এই ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনায় সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের অনুকরণীয় এই ব্যাংকটিকেও ভঙ্গুর ও ব্যর্থদের কাতারে যুক্ত করে দেয়। মাত্র দেড় বছর আগেও যে ব্যাংকটি হাজার হাজার কোটি টাকার তারল্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের পাশে দাঁড়াতে পারতো, সরকারী হস্তক্ষেপ, মালিকানা ও পরিচালনা পরিষদে পরিবর্তনের এক বছরের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকও খেলাপী ঋণে দায়গ্রস্ত ব্যাংকের তালিকায় যুক্ত হয়ে পড়ে। পুঁজি ও আমানতের সদ্ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও গ্রাহকদের আস্থা যে কোন ব্যাংকের জন্য সবচে ভিত্তি ও মূলধন। সরকারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দেশের বৃহত্তম বেসরকারী ব্যাংকটিকে চরম ঝুঁকি ও গ্রাহকের আস্থার সংকটে নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইসলামি ব্যাংক নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপগুলোর দিকে খেয়াল করলে সহজেই বোঝা যায়, ইচ্ছাকৃতভাবেই দেশের সবচে সফল বৃহত্তম ব্যাংকটিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

দেশে বিনিয়োগে ক্ষরা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। সেই যে বিশ্বঅর্থনৈতিক মন্দা এবং ওয়ান-ইলেভেন সরকারের তুলকালাম কান্ডের ভেতর দিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে মন্দা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালের শেষদিকে একটি নির্বাচিত সরকার আসার পরও অবস্থার তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নানাভাবে পর্যুদস্ত ও দুর্বল করে দিয়ে এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী একটি একপাক্ষিক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে দৃশ্যত একটি রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির পরও দেশে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ হয়নি। উপরন্তু দেশ থেকে প্রতিমাসে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। তবে কৃষিখাতের উৎপাদনশীলতা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও গার্মেন্টস রফতানী খাতের হাত ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব কখনোই ৬ শতাংশের নিচে নামেনি। রেমিটেন্সের অর্থ কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফরেক্স রির্জাভে রেকর্ডের ভাঙ্গা-গড়া চলছে। দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য অনেক বেড়ে গেলেও মাথাপিছু আয়ের হিসাবে আমরা এখন আর্ন্তজাতিকভঅবে উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রাথমিক স্বীকৃতি অর্জন করেছি। এর পাশাপাশি পদ্মাসেতুসহ কয়েকটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে ক্ষমতাসীনদের আত্মতুষ্টির অন্ত নেই। পক্ষান্তরে দেশে শিক্ষিত বেকারের বেড়ে যাওয়া, এদের মধ্যে লাখ লাখ তরুণ মাদকাসক্ত হয়ে পড়া, যেনতেন প্রকারে দেশত্যাগের প্রবণতা, সামাজিক অপরাধ মাত্রাহীনভাবে বেড়ে যাওয়া, আকাশ সংস্কৃতি, ডিজিটাল ডিভাইস ও তথ্যপ্রযুক্তির বল্গাহীন ব্যবহারে সামাজিক ও ধর্মীয় -নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের শিকার হওয়ার বাস্তবতা আমাদের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের সম্ভাবনার পথকে দূরুহ করে তুলেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় মধ্যপ্রাচ্য ওপশ্চিমা দুনিয়ায় সস্তাশ্রম ও সুলভ মূল্যে পণ্য সরবরাহের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি আমরা। সরকারীদলের রাজনৈতিক নেতারা যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক রির্জাভের রেকর্ড দেখিয়ে হম্বিতম্বি করেন, তখন তারা ভুলে যান আমাদের যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ছিল এবং আছে তার সিকিভাগও আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি,পারছিনা। বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং গার্মেন্টস রফতানী খাতে আমাদের অন্যতম প্রতিপক্ষ ভিয়েতনামের দিকে তাকালেই আমাদের ব্যর্থতার চিত্র পরিস্কার হয়ে যায়। বিশ্বের এক নম্বর সামরিক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ২০ বছরের বেশী সময় ধরে যুদ্ধ করার পর ১৯৭৩ সালে প্যারিস শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে একটি ধ্বংসস্তুপের উপর স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রে পর্দাপণকারি ভিয়েতনাম রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইতিহাস অনেকটা বাংলাদেশের মত হলেও তাদের জাতীয় ঐক্য ও ঘুরে দাড়ানোর ইতিহাস থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষনীয়। যে শত্রæরাষ্ট্রের সাথে ২০ বছরের বেশী সময় ধরে যুদ্ধ করে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়া ভিয়েতনামে আর কিছুই অবশিষ্ট্য ছিলনা, সেই দেশটি সেই শত্রæ রাষ্ট্রের সাথে চমৎকার দ্বিপাক্ষিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে খুব বেশী সময় লাগেনি। কৃষিপণ্য এবং গার্মেন্টস রফতানীর উপর ভর করে এখন ভিয়েতনামের ফরেক্স রির্জাভ বাংলাদেশের দ্বিগুন। তাদের মাথাপিছু জাতীয় আয়ও আমাদের দ্বিগুন। অথচ ভ‚-রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্থৗনৈতিকভাবে বাংলাদেশ ভিয়েতনামের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকার কথা। পশ্চিমা অর্থনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক গোল্ডম্যান শ্যাক্স এবং হোয়াইট ওয়াটার কুপার্স আরো এক দশক আগে ভবিষ্যদ্বানী করেছিল, ২০২১সালের মধ্যে ভিয়েতনাম বিশ্বের সবচে দ্রæততম প্রবৃদ্ধির অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিনত হবে। এসব ভবিষ্যদ্বানীর চেয়েও বেশী দ্রæত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ভিয়েতনাম। তাদের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ ভাগ। পরিবেশ ও জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের সাথে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কোন তুলনাই চলেনা। সায়গন নদীর তীরে অবস্থিত ভিয়েতনামের রাজধানীর নামও ছিল সায়গন দুই ভিয়েতনাম এক হওয়ার পর হোচি মিন সিটির পাশ দিয়ে সায়গন নদীর পানি একইভাবে বয়ে যাচ্ছে। আর মাত্র চল্লিশ বছরের মধ্যে ঢাকার প্রাণপ্রবাহ বুড়িগঙ্গা নদীর প্রাকৃতিক উপযোগিতা হারিয়ে একটি বিষাক্ত, দুর্গন্ধযুক্ত নহরে পরিনত হয়েছে। ভিয়েতনামের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও অপরাজনীতি ও সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও ব্যর্থতার কারণে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেনা বাংলাদেশ।

সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা যাই বলুন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক যেমনই থাক, আগামীদিন গুলোতে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদি হওয়ার জায়গাগুলো যেন ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। আর এই নৈরাশ্যবাদিতার পেছনে কাজ করছে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা এবং একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংলাপ বা বোঝাপড়া না থাকা। গত ১০ বছরে দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ও অর্থনৈতিক খাতগুলোতে কি হয়েছে তা আগেই কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীল অবস্থা বজায় থাকা সত্বেও গত ৫ বছরে দেশে তেমন কোন বিনিয়োগ হয়নি। উপরন্তু গার্মেন্টস রফতানী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়া এমনকি মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন নিষেধাজ্ঞা ও জটিলতা সৃষ্টির মূলেও দেশের রাজনৈতিক অবস্থাকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতিসংঘসহ পশ্চিমা উন্নয়ন সহযোগিরা একটি রাজনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। মূলত আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অনড় অবস্থানের কারণেই সে সব উদ্যোগ সফল হয়নি। নির্বাচনের আগে বিরোধিদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ার পারসন খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রীর একটি টেলিফোনের সুত্র ধরে সরকারী দলের তরফ থেকে সমঝোতা না হওয়ার জন্য খালেদা জিয়াকেও দায়ী করা হয়। দোষারোপ ও আপসহীনতার এই রাজনীতি বাংলাদেশের বিশাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বার বার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জাতির সংকট ও সম্ভাবনাকে ঘিরে যে বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হচ্ছে, রাজনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতার মত এমন অপরিহার্য্য ইস্যুকে একটি টেলিফোন বা অন্যকোন আবেগের দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করে রহিত করা যায়না। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আমাদের বাণিজ্যিক প্রতিদ্ব›িদ্ব ও আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক ভ‚-রাজনীতির অংশিদাররা যখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ক‚টনৈতিকভাবে আমাদেরকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, তখন শুধুমাত্র ক্ষমতাকেন্দ্রিক দলীয় রাজনীতির অহমিকা ও আবেগের কাছে বন্দি হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। মুখের কথায় শোনা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারীদলে প্রভাবশালী নেতারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মত আরেকটি একপাক্ষিক নির্বাচন চাননা। তবে সকল দলের জন্য সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করবে এমন রাজনৈতিক পরিবেশ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছেনা। আর মাত্র ৩মাস পরেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করবে নির্বাচন কমিশন। দেশের বর্তমান বাস্তবতায় একটি গ্রহনযোগ্য ও অংশগ্রহণর্মূলক নির্বাচনের উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করা শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। যে সাংবিধানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচন ব্যবস্থার উপর বেশীরভাগ রাজনৈতিক দল ও জনগনের অনাস্থা তৈরী হয়েছে সেই অনাস্থা দূর না করে, নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি’র নিবন্ধন বাতিল হতে পারে শুধুমাত্র এই জুজুর ভয় দেখিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে ক্ষমতাসীনরা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উপর বাংলাদেশের আগামী দিনের সম্ভাবনা ও সংকটের অনেক কিছুই নির্ভর করছে।

বাংলাদেশের বিগত জাতীয় নির্বাচন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চরম অবক্ষয় এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ক্ষমতার জোরে কুক্ষিগত করে রখার প্রবণতাকে এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছে। বিভিন্ন পশ্চিমা সংস্থার এমন মূল্যায়নকে সরকার থোড়াই কেয়ার করছে। বিগত এক-এগারো সরকারের করা একটি প্রশ্নবিদ্ধ দুর্নীতি মামলায় ইতিমধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাজার রায় দিয়ে এবং বেগম জিয়ার আপীল ও জামিন নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের অমানবিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে সরকার বিএনপিকে নির্বাচনের মাঠের বাইরে রাখতে চাইছে, জনসাধারণের মধ্যেও এমন ধারনা জন্মেছে। এর মানে হচ্ছে, সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যেনতেন প্রকারে নির্বাচনের বাইরে রেখে ক্ষমতাসীনরা অন্তত আরেকবারের জন্য ক্ষমতা নিশ্চিত করতে চাইছে। এক এগারো সরকারের সাথে গোপণ সমঝোতার মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে একাত্তরের মানবতা বিরোধি অপরাধের বিচারসহ নানাবিধ রাজনৈতিক-প্রশাসনিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে দেশে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ তৈরী করা হয়। তবে কিছু মেগা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশে উন্নয়নের জিগির তুলে সরকারের সব অগণতান্ত্রিক আচরণ ও সিদ্ধান্তকে যায়েজ করার চেষ্টা অব্যাহত আছে। এ দেশের মানুষ উন্নয়ন বলতে শুধু ব্রীজ কালভার্ট, ফ্লাইওভার, মেট্টোরেল বা রাস্তা প্রশ্বস্তকরণকেই বোঝেনা। এমন উন্নয়নের দোহাই দিয়ে আইয়ুব খান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ঠেকাতে পারেননি। এ দেশের মানুষ অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সুশাসন ও জনগনের রাজনৈতিক-মানবিক অধিকারের নিশ্চয়তাকেই বেশী মূল্যবান বলে মনে করে। এ কারণেই আইয়ুব খান বা এরশাদের উন্নয়নের দাবী যেমন জনগনের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। একইভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অনাস্থার সংকটে ফেলে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের দাবীও জনসমর্থন পাচ্ছেনা। রাষ্ট্রের প্রধান ও সবচে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে এর জনগন বা মানব সম্পদ। রাষ্ট্র গঠনের মূলেই রয়েছে জনগনের অভিপ্রায়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থ্ াএবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সংরক্ষণ আমাদের জনগনের সাধারণ অভিপ্রায়। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সব রাজনৈতিক সংগ্রাম, একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ এবং আশির দশকের স্বৈরাচার বিরোধি আন্দোলনে জাতীয় ঐক্য ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় ইতিহাসে বার বার এই সত্য প্রমানীত হয়েছে। বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি জাতির গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিক্রমায় নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দলটিই শুধুমাত্র ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকতে আমাদের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ঐক্য ও স্থিতিশীলতার পথে এখন অনবরত হিংসা ও প্রতিবন্ধকতার প্রাচীর গড়ে তুলছে। রাজনৈতিক বিভেদ-বৈরীতার সুযোগ নিয়ে মিয়ানমারের মত অনগ্রসর প্রতিবেশী দেশ লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে উস্কানীমূলক আচরণের সাহস পাচ্ছে। বাংলাদেশের কাছ থেকে বিনা মাশুলে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের মত স্পর্শকাতর লক্ষ্য অর্জনের সফল হওয়ার পরও তিস্তার পানি বন্টনের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বাংলাদেশ পাত্তা দিচ্ছেনা ভারত। দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থাকলে, জাতীয় ইস্যুতে সব রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে সমঝোতা ও সহাবস্থানের সুষ্ঠু পরিবেশ থাকলে ১৭ কোটি মানুষের বিশাল সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক আগেই কোরিয়া, মালয়েশিয়ার কাতারে সামিল হতে পারত। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এখনো হয়তো সম্ভব।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

আজকের প্রশ্ন

খুলনা সিটি নির্বাচনের ভোটকে ‘প্রহসন’ বলেছেন বিএনপি ও বামপন্থিরা। আপনি কি একমত?