বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

সোমবার, ২৫ জুন, ২০১৮, ১১:৫৪:১৪

ওদের সঙ্গে বিচারক কাঁদল, আইনজীবী কাঁদল; কাঁদল সবাই!

ওদের সঙ্গে বিচারক কাঁদল, আইনজীবী কাঁদল; কাঁদল সবাই!

ঢাকা: এজলাসের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে আর অঝোরে কাঁদছে দুটি শিশু। যে কান্নার অশ্রু ছুঁয়ে গেছে সেখানে উপস্থিত তাদের মা-বাবাসহ প্রত্যেককে আদালতের এজলাস। উপস্থিত বিচারক, আইনজীবীসহ আরো অনেকে। যাদের অপলক দৃষ্টি দুইটি শিশুর দিকে। এ যেন আদালত কক্ষের নজিরবিহীন এক দৃশ্য!

এসময় বাচ্চা দুটি কান্না করতে করতে তাদের মাকে জড়িয়ে ধরে ভবলে, আমরা তোমাদের দুজনকে চাই। তোমরা এক সাথে হয়ে যাও। না হলে আমরা তোমাদের কারো কাছে থাকব না।

দুই বিচারপতির সামনে মাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে এমনিভাবে আকুতি জানায় শিশু মিয়া মো. সালিম সাদমান ধ্রুব (১২)। একই আকুতি জানায় ধ্রুবর ছোট ভাই মিয়া মো. সাকিব সাদমান লুব্ধকও (৯)।

এ সময় ধ্রুব তার বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে ডাকতে থাকে, ‘বাবা তুমি এদিকে এসো। আম্মুকে সরি বলো। আমরা আর কিছু চাই না। তোমাদের একত্রে দেখতে চাই।’

জানা যায়, রাজশাহীর মেয়ে কামরুন্নাহার মল্লিকার সাথে ছাত্রজীবনে রাজধানীতে পরিচয় হয় মাগুরার ছেলে মেহেদী হাসানের। তারপর দু’জনার প্রেম, বিয়ে। ২০০২ সালে আনুষ্ঠানিক বিয়ের পর তাদের ঘর আলোকিত করে আসে ফুটফুটে দুটি পুত্র সন্তান।

বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করা স্বামী মেহেদীর সাথে শিক্ষিকা মল্লিকার সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। যার সমাপ্তি ঘটে বিবাহ বিচ্ছেদের মাধ্যমে।

দুই শিশুর মা কামরুন্নাহার মল্লিকা রাজশাহীর মেয়ে। পড়তেন ঢাকা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে। বাবা মিয়া মো. মেহেদী হাসান, মাগুরার ছেলে। পড়ালেখা করেছেন ঢাকা কলেজে। পড়ালেখা অবস্থায় দুজনের পরিচয়। পরিচয় থেকে প্রেম। এরপর ২০০২ সালে বিয়ে হয় তাঁদের। শুরু হয় দাম্পত্য জীবন। দুজনের ঘর আলোকিত করে আসে দুটি ফুটফুটে সন্তান। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয় দুই ছেলেকে।

পড়ালেখা শেষ করে মেহেদী একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন, মল্লিকা একটি বেসরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা। ভালোই চলছিল সংসার। একপর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য ঘটে। এ মনোমালিন্য শেষ হয় বিবাহ বিচ্ছেদের মাধ্যমে। ২০১৭ সালের ১২ মে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।

স্বামী মেহেদী হাসান স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার এক সপ্তাহ আগে দুটি সন্তানকে গ্রামের বাড়ি মাগুরায় পাঠিয়ে দেন। বোনের তত্ত্বাবধানে মাগুরার জেলা শহরের একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়।

মেহেদী হাসান ঢাকার উত্তরায় থাকলেও দুই ছেলের সুখের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি সন্তানদের ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেন। মাগুরায় বড় হচ্ছিল শিশু দুটি। এই এক বছর মা-সন্তানদের মধ্যে কোনো দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি।

এক পর্যায়ে দুই সন্তানকে নিজ হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে শিশু দুটিকে ২৫ জুন হাইকোর্টে হাজির করতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও শিশু দুটির বাবাকে নির্দেশ দেন আদালত। সেই সঙ্গে সন্তানদের কেন তাদের মায়ের হেফাজতে দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

আদেশ অনুযায়ী শিশু দুটিকে সোমবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে আনা হয়। এ সময় শিশু দুটির বাবা-মা, মামা, নানী ও ফুফুসহ আত্মীয়-স্বজনের আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এরপর শুরু হয় শুনানি। এক পর্যায়ে শিশু দুটির বক্তব্য শুনতে চান আদালত।

বেঞ্চের বিচারক মা-বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এই দৃশ্য দেখেও কি আপনাদের মন গলে না? আপনারা কি এই ছোট্ট সন্তানদের জন্য নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করতে পারবেন না? সামনে তাকিয়ে দেখেন আপনাদের এই দৃশ্য দেখে সকলের চোখেই পানি আসছে।

আদালতে উভয় পক্ষের আইনজীবীসহ অন্যান্য আইনজীবী দাঁড়িয়ে সমস্বরে সন্তানদের বিষয়টি চিন্তা করতে বাবা-মার প্রতি আহবান জানান।

সেই সঙ্গে এই দুই সন্তানদের চাওয়া অনুযায়ী তাদের বাবা-মার দাম্পত্য জীবন যাতে বজায় থাকে এ এমন একটি আদেশের জন্য আদালতের প্রতি আহবান জানান।

এ পর্যায়ে আদালত ওই বাবা-মা এবং তাদের আইনজীবীদের খাস কামরায় ডেকে নেন। এবং পরবর্তিতে এজলাসে এসে আদেশ দেন হাইকোর্ট বেঞ্চ।

আগামী ৪ জুলাই পর্যন্ত শিশু সন্তান দুটি মায়ের হেফাজতে থাকবে। তবে এই সময়ে বাবা শিশু দুটির দেখাশোনা করার অবারিত সুযোগ পাবেন।

৪ জুলাই পরবর্তী দিন ঠিক করে সেদিন শিশু দুটিকে হাজির করার নির্দেশ দিয়ে বিষয়টি মুলতবি করেন। একইসঙ্গে শিশুদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ সময় দেওয়ার জন্য বাবা-মাকে নির্দেশ দেন।

রায়ের পর আদালত দুই শিশুকে কাছে ডেকে নিয়ে বলেন, তোমরা আবার আসবে। ওই দিন আমাদের জানাবে, তোমাদের বাবা-মা তোমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। ভালো থেক।

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি জাতিসংঘে যাওয়ায় সরকার আতঙ্কিত - ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের এ বক্তব্য সমর্থন করেন কি?